পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বাজেট দিল বিজেপি সরকার

এশিয়া পোস্ট নিউজ, কলকাতা
পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বাজেট দিল বিজেপি সরকার
বাজেট পেশের আগে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর সঙ্গে ছবি তুলেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। সোমাবর (২২ জুন) দুপুর ১২টায় ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য এ বাজেট পেশ করেন স্বপন দাশগুপ্ত। বাজেটে রাজ্যে একাধিক নতুন জেলা তৈরির প্রস্তাব পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী। 

Advertisement

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমানে ২৩ টি জেলা রয়েছে। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য এরমধ্যে বেশকিছু বড় জেলা ভেঙে নতুন আরও পাঁচটি জেলা তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি মহকুমা ও পৌরসভা করারও প্রস্তাব এনেছেন অর্থমন্ত্রী।

প্রস্তাবিত নতুন ৫ জেলা হলো- বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর, আরামবাগ ও নতুন একটি মহকুমা হবে গোপীবল্লভপুর। এ ছাড়া নতুন সাতটি পৌরসভার মধ্যে রয়েছে, শিবমন্দির, গাজল, চাঁচল, বেলদা, বাদনানা, কামারপুকুর ও কোলাঘাট।

বাজেটে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের ওপরে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের শিল্পখাতে শিল্পপতিদের আকর্ষণ করতে ৫০০০ কোটি টাকার ইনসেনটিভ স্কিম, ওয়ান উইন্ডো পারমিশন ও প্রয়োজন ভিত্তিতে ল্যান্ড সিলিং বিবেচনা করার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া কলকাতায় বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জ চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। 

শিল্পপতিদের আকর্ষণ করার জন্য রাজ্যের পরিবহন অবকাঠামোর ওপরে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কলকাতা বিমানবন্দরের ওপর চাপ কমাতে কলকাতার কাছে কল্যাণীতে নতুন বিমানবন্দর তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বাজেটে। কল্যাণীর কাছে একটি ‘গ্রিনফিল্ড’ বিমানবন্দর তৈরি করতে ১০০০-১৫০০ একর জমি শনাক্ত করবে সরকার। পাশাপাশি কেন্দ্রের উড়ান প্রকল্পের আওতায় পুরুলিয়া, বালুরঘাট এবং মালদহেও বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। 

এতদিন শুধু কলকাতা ও আশপাশের এলাকার মানুষ মেট্রোরেলের সুবিধা পেয়ে এসেছেন। যদিও এবার রাজ্যের অন্যান্য জেলার মানুষও মেট্রো পেতে চলেছেন। দুর্গাপুর, আসানসোল ও শিলিগুড়িতে মেট্রো চালু করা হবে। সেই মতো একটি সার্ভে শুরু করার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী ।

কলকাতার পাশে মেদিনীপুরে নতুন গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি। সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিক ব্রিজ তৈরির ঘোষণা ও রেল যোগাযোগের জন্য জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বাজেটে। 

বিজেপি সরকার বলছে, বেকারত্ব কমিয়ে আনাকে এই বাজেটের মূল লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের জট খুলতে বাজেটে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দপ্ত প্রায় এক লাখ শূন্যপদে নতুন কর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। শূন্যপদগুলোর মধ্যে ২০ হাজার পুলিশ, ৫০ হাজার শিক্ষক এবং অশিক্ষক কর্মী এবং এক হাজার ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল (ইএফআর) নিয়োগ করা হবে। শূন্যপদের ১০ শতাংশ অগ্নিবীরদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সের ঊর্ধ্বসীমা ইতোমধ্যে ৫ বছর ছাড় দেওয়া হবে। এই সুবিধা পরবর্তী ২ বছরের জন্য বহাল থাকবে।

বাজেটে রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের জন্য সুখবর শুনিয়েছে বিজেপি সরকার। রাজ্য সরকারি কর্মী, পেনশনভোগীদের আরও ২০ শতাংশ ডিএ ঘোষণা করেছে, রাজ্য সরকারি কর্মীদের ডিএ ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে হলো ৩৮ শতাংশ। ১ অক্টোবর থেকে সরকারি কর্মীদের নতুন হারে ডিএ কার্যকর হবে ।

অর্থমন্ত্রী স্বপন বলেন, প্রাথমিকের মিড ডে মিলে উপকরণ পিছু খরচ ১০ টাকা করা হবে। ইসকনের সহযোগিতায় কলকাতা পৌরসভা এলাকার বিভিন্ন স্কুলে পুষ্টিকর রান্নার জন্য মি়ড ডে মিল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। কাঁথি, কালিয়াচক, তুফানগঞ্জ, ফলতায় মহিলা কলেজ গড়ে তোলা হবে। ঝাড়গ্রামে গড়ে তোলা হবে আদিবাসী বিশ্ববিদ্যালয়। যার জন্য বরাদ্দ করা হবে ১০০ কোটি টাকা। এছাড়া, ১০০ জন মেধাবী পড়ুয়াদের জন্য স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট কাম মিন্স স্কলারশিপ বরাদ্দ করা হবে। কলকাতায় একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। উত্তরবঙ্গে গড়ে তোলা হবে একটি আইআইটি, আইআইএম এবং একটি এমস। ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়ায় দু’টি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হবে। তৈরি করা হবে ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্ত্রী জানান, যারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সেই সমস্ত সরকার ও সরকার পোষিত কলেজের পড়ুয়াদের এককালীন ৩০ হাজার টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য রাজ্যে বিনামূল্যের কোচিং সেন্টার চালু করা হবে। রাজ্যের প্রতিটি জেলায় এরকম বিনামূল্যের কোচিং সেন্টার থাকবে। রাজ্যে আদর্শ বিদ্যালয় গড়ে তোলার জন্য ২১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে। পাশাপাশি, সংস্কৃত কলেজ ও সংস্কৃত ভাষার প্রসারের জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে ৫০ কোটি টাকা। স্কুল ড্রপ আউট রুখতে উচ্চ শিক্ষায় নারীদের দেওয়া হবে ৫০ হাজার টাকা। মিড ডে মিলের জন্য ৪৭ শতাংশ বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে।

অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন, এখন থেকে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ধর্মীয় স্থানের এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো মদের দোকানের লাইসেন্স দেওয়া হবে না। কলকাতা পৌরসভার ক্ষেত্রে এই লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম দূরত্ব হবে ৫০০ মিটার।

স্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনে চুক্তিভিত্তিক কন্ডাক্টরদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করে মাসে ১৬ হাজার টাকা করা হবে। সিভিক ভলান্টিয়ার, ভিলেজ পুলিশ ও গ্রিন পুলিশদের পারিশ্রমিকও ২০০০ টাকা করে বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। হোমগার্ডদেরও পারিশ্রমিক বৃদ্ধি পাচ্ছে ২০০০ টাকা। বয়স্ক, বিধবা এবং বিশেষ ভাবে সক্ষমদের মাসিক ভাতা ৫০০ টাকা করে বৃদ্ধির ঘোষণা করা হয় বাজেটে।

নারীদের বিনামূল্যে বাস পরিষেবার জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে ৫৫০ কোটি টাকা। এই উদ্দেশ্যে শিগগির পিংক কার্ড চালু করা হবে বলে ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া নারীদের মাসিক সহায়তা প্রকল্প অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বাজেটে। 

এ ছাড়াও রাজ্যের ২৯৪ জন বিধায়কের জন্য বিধায়ক তহবিল ৭০ লাখ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১ কোটি টাকা করা হচ্ছে। ২১ থেকে ৪৫ বছর বয়সি যোগ্য-শিক্ষিত বেকার যুবকদের মাসিক ভাতা দেওয়ার জন্য অক্টোবর থেকে ভরসা কর্মসূচি চালু হবে। এই প্রকল্পে স্নাতক বেকারদের জন্য মাসে ৩০০০ টাকা এবং অন্যদের মাসে ২০০০ টাকা ভাতা দেওয়া হবে। রাজ্যের মোট ৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৯১ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে বলে জানান তিনি।