কলকাতার সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউর নাম গোপাল মুখোপাধ্যায় করা নিয়ে বিতর্ক

কলকাতার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউর নাম পরিবর্তন করে ‘গোপাল মুখোপাধ্যায় রোড’ করার সরকারি সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। কলকাতা পৌর করপোরেশনের এই পদক্ষেপকে বিজেপির পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক সংশোধন বলে স্বাগত জানানো হলেও, বিরোধী দলগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
বিরোধীদের অভিযোগ, উন্নয়ন ও নাগরিক সমস্যা সমাধানের চেয়ে ইতিহাসের নামফলক পাল্টানো এখন বিজেপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে।
কলকাতা পৌর করপোরেশনের জারি করা নতুন বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পার্ক সার্কাস এলাকায় অবস্থিত দীর্ঘদিনের সুপরিচিত ‘সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ’ এখন থেকে সরকারি নথিতে ‘গোপাল মুখোপাধ্যায় রোড’ নামে পরিচিত হবে। এই সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে স্বাগত জানিয়ে দাবি করেন, এটি প্রকৃত নায়কদের সম্মান জানানোর এবং ইতিহাসের ভুল সংশোধনের উপযুক্ত সময়। তার এই মন্তব্যের পর থেকে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক দানা বেঁধেছে।
বিজেপি সমর্থক ও নেতাদের দাবি, বাংলার ইতিহাসে যাদের অবদানকে দীর্ঘ সময় ধরে উপেক্ষা করা হয়েছে, তাদের সামনে আনার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে ১৯৪৬ সালের কলকাতার ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে গোপাল মুখোপাধ্যায় তথা ‘গোপাল পাঁঠা’ যেভাবে আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তার ভূমিকার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবেই এই নামকরণ।
বিপরীতে, বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের অভিযোগ, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে শহর ও প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা মূলত রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার একটি কৌশল। ইতিহাসকে নতুন করে ব্যাখ্যা করার নামে নির্বাচিত কিছু নামকে তুলে ধরা হচ্ছে এবং অন্য অংশকে আড়ালে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে তারা দাবি করেন।
ঐতিহাসিক নথিপত্র এবং ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল গেজেট অনুযায়ী, প্রায় এক শতাব্দী আগে ১৯৩৩ সালের ২০ এপ্রিল তৎকালীন ক্যালকাটা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট ১০০ ফুট চওড়া রাস্তাটির নামকরণ করেছিল। তবে এটি ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার বিতর্কিত মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শাহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে নয়, বরং তার কাকা স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর সম্মানে করা হয়েছিল।
কে ছিলেন এই স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দী?
স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দী (১৮৮৪–১৯৪৬) ছিলেন একাধারে একজন সম্মানিত চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষাবিদ। ১৯৩৩ সালে যখন এই রাস্তাটি তৈরি হয়, তখন এই অঞ্চলেই স্যার হাসানের পারিবারিক বাসস্থান ‘কাশানা’ অবস্থিত ছিল। মূলত সেই কারণেই তার নামে এই অ্যাভিনিউয়ের নামকরণ করা হয়। প্রায় এক শতাব্দী পর সেই নাম বদলে দেওয়া হলো।
কে ছিলেন এই গোপাল মুখোপাধ্যায়?
গোপাল মুখপাধ্যায় শহরবাসীর কাছে তার পারিবারিক মাংসের ব্যবসার সূত্রে ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন। ১৯৪৬ সালের কলকাতার দাঙ্গার সময় এক কিংবদন্তি চরিত্র হয়ে ওঠেন তিনি। তবে তিনি ইতিহাসে একজন কুখ্যাত হত্যাকারী হিসেবেও পরিচিত। ইতিহাসে একপক্ষ তাকে যুবকদের সংগঠিত করে সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলা এবং পাল্টা আঘাত হেনে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার কথা বলে, অন্যপক্ষ বলে তিনি একজন হত্যাকারী। কলকাতার একটি বড় অংশের মানুষের কাছে তিনি তৎকালীন গণহত্যার হাত থেকে হাজার হাজার প্রাণ বাঁচানো এক ‘ত্রাতা’ হিসেবে গণ্য হন, যদিও বাংলার দাঙ্গার ইতিহাসে তার এই ভূমিকা আজও এক বিতর্কিত অধ্যায়।
১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট মুসলিম লিগের ডাকা ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-র সময় হোসেন শাহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। ওই দিনটি কলকাতার ইতিহাসে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস’ বা ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রূপ নেয়।








