
বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের রান্নাঘরে সরিষার তেল একটি পরিচিত নাম। মাছ ভাজা থেকে শুরু করে ভর্তা, আচার কিংবা বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী রান্নায় এর ব্যবহার দীর্ঘদিনের। তীব্র ঘ্রাণ ও ঝাঁঝালো স্বাদের কারণে অনেকের কাছে সরিষার তেল খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়।
তবে সরিষার তেল নিয়ে যেমন রয়েছে স্বাস্থ্য উপকারিতার আলোচনা, তেমনি রয়েছে কিছু বিতর্কও। গবেষণায় দেখা গেছে, এতে কিছু উপকারী উপাদান থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু উপাদান স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
সরিষা গাছের বীজ থেকে তেল নিষ্কাশন করে সরিষার তেল তৈরি করা হয়। এটি মূলত উদ্ভিজ্জ তেল এবং এতে বিভিন্ন ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। সরিষার তেলের ঝাঁঝালো স্বাদের পেছনে রয়েছে অ্যালাইল আইসোথায়োসায়ানেট নামের একটি যৌগ। একই ধরনের যৌগ হর্সর্যাডিশ এবং ওয়াসাবিতেও পাওয়া যায়।
২০২৩ সালের একটি গবেষণা পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরিষার তেলে থাকা অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য কিছুটা উপকারী হতে পারে। সরিষার তেলে মনোআনস্যাচুরেটেড এবং পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি, আর স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ কম।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট রক্তে ক্ষতিকর খারাপ কোলেস্টেরলের (LDL) মাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে। এতে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের দঝুঁকি কমার সম্ভাবনা থাকে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, শুধুমাত্র সরিষার তেল খাওয়ার কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে এমন ধারণা সঠিক নয়। সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সরিষার তেলে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে, যা শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ হৃদরোগ, বাত এবং কিছু ধরনের ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রাখা স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া সরিষার তেলে থাকা অ্যালাইল আইসোথায়োসায়ানেট নামের যৌগটিরও প্রদাহবিরোধী বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে বলে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে বর্তমানে এই উপকারিতাগুলো নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত গবেষণা নেই।
সরিষার তেল প্রায় সম্পূর্ণই চর্বি দিয়ে তৈরি, তাই এটি উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাদ্য। প্রতি ১০০ গ্রাম সরিষার তেলে রয়েছে প্রায় ৮৮৪ ক্যালরি।
একই পরিমাণ তেলে আরও থাকে-
সরিষার তেলের সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয় হলো এরুসিক অ্যাসিড। এরুসিক অ্যাসিড একটি মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড, যা সরিষার তেলে তুলনামূলক বেশি পরিমাণে থাকতে পারে। কিছু গবেষণায় প্রাণীদের ওপর এরুসিক অ্যাসিডের নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। বিশেষ করে ইঁদুরের ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতির সঙ্গে এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে এখন পর্যন্ত মানুষের হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর এরুসিক অ্যাসিডের ক্ষতিকর প্রভাবের সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) ২০১৬ সালে জানায়, উচ্চমাত্রার এরুসিক অ্যাসিড থাকার কারণে সরিষার তেল রান্নার তেল হিসেবে নিরাপদ বলে বিবেচিত হয় না। এই কারণে যুক্তরাষ্ট্রে সরিষার তেল রান্নার তেল হিসেবে বিক্রির অনুমতি নেই। সেখানে বিক্রি হওয়া সরিষার তেলের বোতলে সাধারণত বাহ্যিক ব্যবহারের জন্য লেখা থাকে।
তবে বিশ্বের অনেক দেশ, বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে সরিষার তেল এখনও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে, ভারতের লিপিড অ্যাসোসিয়েশন সরিষার তেলকে হৃদ্বান্ধব তেলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করে।
বর্তমানে বাজারে কম এরুসিক অ্যাসিডযুক্ত সরিষার তেলও পাওয়া যায়, যা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। যারা সরিষার তেল ব্যবহার করতে চান, তারা বিশ্বস্ত উৎসের তেল বেছে নিতে পারেন এবং পরিমিত পরিমাণে ব্যবহার করতে পারেন।
তবে যারা ঝুঁকি এড়াতে চান, তারা অলিভ অয়েল, ক্যানোলা অয়েল বা অন্যান্য উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহার করতে পারেন।
সরিষার তেল শুধু রান্নাতেই নয়, ত্বক ও চুলের যত্নেও ব্যবহৃত হয়। এসেনশিয়াল অয়েল হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি সরাসরি ত্বকে না লাগিয়ে অন্য কোনো ক্যারিয়ার অয়েলের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা উচিত। যাদের অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। সরিষার এসেনশিয়াল অয়েল মুখে খাওয়া নিরাপদ নয়।
সরিষার তেলে উপকারী ফ্যাটি অ্যাসিড ও কিছু সম্ভাব্য স্বাস্থ্যকর উপাদান রয়েছে, যা হৃদ্স্বাস্থ্য ও প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব উপকারিতার পক্ষে এখনও পর্যাপ্ত ও শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
অন্যদিকে, এরুসিক অ্যাসিডের উপস্থিতির কারণে সরিষার তেল নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। তাই এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিমিতি ও সচেতনতা জরুরি। ভবিষ্যতে আরও গবেষণা সরিষার তেলের প্রকৃত উপকারিতা ও ঝুঁকি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা দিতে পারে।
সূত্র: মেডিকেল নিউজ টুডে