
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্রিন টি শুধু একটি পানীয় নয়, বরং সুস্থ জীবনযাপনের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবেও এর পরিচিতি রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত গ্রিন টি পান শরীর ও মনের জন্য নানা ধরনের উপকার বয়ে আনতে পারে। তবে এটি কোনো অলৌকিক ওষুধ নয়। বরং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের অংশ হিসেবে এটি সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
নিচে গ্রিন টির ১০টি সম্ভাব্য উপকারিতা তুলে ধরা হলো।
শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর
গ্রিন টিতে ক্যাটেচিন নামের এক ধরনের পলিফেনল থাকে, যা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিকেলের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
গ্রিন টির সবচেয়ে পরিচিত ক্যাটেচিন হলো ইপিগ্যালোক্যাটেচিন-৩-গ্যালেট বা EGCG। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এটি শরীরের নানা রোগঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা উন্নত করতে পারে
গ্রিন টিতে থাকা ক্যাফেইন এবং এল-থিয়ানিন নামের উপাদান মস্তিষ্কের কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২০ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত গ্রিন টি পান করেন, তাদের মধ্যে বয়সজনিত স্মৃতিশক্তি হ্রাস বা জ্ঞানীয় দুর্বলতার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
চর্বি পোড়াতে সহায়তা করতে পারে
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যায়ামের সঙ্গে গ্রিন টি পান করলে শরীরের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম আরও সক্রিয় হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রিন টি একা খুব বেশি ওজন কমাতে না পারলেও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়ামের সঙ্গে এটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
কিছু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে
গবেষণার ফলাফল পুরোপুরি একমত না হলেও কিছু গবেষণায় গ্রিন টি পানকারীদের মধ্যে ফুসফুস ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি তুলনামূলক কম দেখা গেছে।
তবে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি যে গ্রিন টি সরাসরি ক্যানসার প্রতিরোধ করে। তাই এ বিষয়ে আরও উচ্চমানের গবেষণা প্রয়োজন।
বয়সজনিত মস্তিষ্কের ক্ষয় ধীর করতে পারে
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রিন টিতে থাকা EGCG এবং এল-থিয়ানিন মস্তিষ্কের এমন কিছু পরিবর্তন কমাতে সাহায্য করতে পারে, যা আলঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে অতিরিক্ত চা পানও ঝুঁকিমুক্ত নয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে ১৩ কাপ বা তার বেশি চা পান করলে আলঝেইমারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই পরিমিতি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
মুখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে
গ্রিন টির অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান মুখের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া কমাতে সাহায্য করতে পারে।
কিছু গবেষণায় গ্রিন টি বা গ্রিন টি নির্যাস ব্যবহারের সঙ্গে মুখের স্বাস্থ্য উন্নতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে মানুষের ওপর আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে
২০২০ সালের একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গ্রিন টি স্বল্পমেয়াদে খালি পেটে রক্তে শর্করার মাত্রা কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
এছাড়া ২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, যারা প্রতিদিন গ্রিন টি পান করেন তাদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসজনিত মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলক কম হতে পারে। তবে সব গবেষণার ফল এক নয়, তাই বিষয়টি এখনও গবেষণাধীন।
হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পারে
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত গ্রিন টি পান রক্তচাপ এবং রক্তের ক্ষতিকর চর্বির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
এসব কারণ হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
ওজন কমাতে সহায়ক হতে পারে
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত গ্রিন টি পান করেন তাদের মধ্যে পেটের চর্বি বা অ্যাবডোমিনাল ওবেসিটির ঝুঁকি কম হতে পারে।
তবে গ্রিন টি ক্ষুধা বা পেট ভরার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে না। তাই শুধুমাত্র গ্রিন টির ওপর নির্ভর করে ওজন কমানোর আশা করা ঠিক নয়।
দীর্ঘায়ুতে ভূমিকা রাখতে পারে
গ্রিন টির বিভিন্ন উপকারী উপাদান হৃদরোগ ও কিছু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপনে ভূমিকা রাখতে পারে।
জাপানে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন পাঁচ কাপ বা তার বেশি গ্রিন টি পান করেন, তাদের মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলক কম ছিল। আরেকটি গবেষণায় দিনে সাত কাপ গ্রিন টি পানকারীদের মধ্যে সব ধরনের কারণে মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম দেখা গেছে।
বেশিরভাগ সুস্থ মানুষের জন্য প্রতিদিন গ্রিন টি পান করা নিরাপদ। গবেষণাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দিনে ৩ থেকে ৫ কাপ গ্রিন টি পান করলে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্য উপকার পাওয়া যেতে পারে।
সাধারণভাবে দিনে ১ থেকে ৩ কাপ গ্রিন টি পান করা ভালো বলে মনে করা হয়। তবে মনে রাখতে হবে, বেশিরভাগ গ্রিন টিতে ক্যাফেইন থাকে। তাই দিনে ১০ কাপের বেশি পান না করাই ভালো।
কিছু গবেষণায় পেটের চর্বি কমানোর সঙ্গে গ্রিন টির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এটি যে সরাসরি চর্বি কমায়, সে বিষয়ে এখনও পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
গ্রিন টি একটি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ পানীয়, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহের পাশাপাশি মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে এটি কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত ব্যায়ামের সঙ্গে গ্রিন টি যুক্ত করলে এর উপকারিতা সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়।
সূত্র: হেল্থলাইন