logo
Advertisement

১ কোটি ৪০ লাখ টাকার বৈভবের মূল্য দাঁড়াল ৪৪ কোটির বেশি

১ কোটি ৪০ লাখ টাকার বৈভবের মূল্য দাঁড়াল ৪৪ কোটির বেশি
বৈভব সূর্যবংশী। ছবি: সংগৃহীত

আইপিএল ২০২৬ এ বৈভব সূর্যবংশী শুধু ব্যাট হাতে রেকর্ড ভাঙেননি, রাজস্থান রয়্যালসের বিনিয়োগের হিসাবও বদলে দিয়েছেন। ১.১০ কোটি রুপিতে কেনা এই তরুণ ওপেনারের মৌসুমকে একটি কাস্টম প্লেয়ার ইমপ্যাক্ট মডেল মূল্যায়ন করেছে প্রায় ৩৪.৯৭ কোটি রুপিতে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৪৪.৬৪ কোটি টাকা।

রাজস্থানের খরচ ছিল প্রায় ১.৪০ কোটি টাকা। সেই হিসেবে বৈভবের মাঠের পারফরম্যান্স থেকে মডেল অনুযায়ী লাভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩.২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজস্থান যে অর্থ খরচ করেছিল, তার তুলনায় রিটার্ন এসেছে প্রায় ৩১.৭৯ গুণ।

এই হিসাব অবশ্য কোনো অফিসিয়াল আইপিএল বা বিসিসিআই মূল্যায়ন নয়। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে ব্যবহৃত একটি কাস্টম প্লেয়ার ইমপ্যাক্ট মডেল বল-বাই-বল ডেটা থেকে প্রতিটি ডেলিভারির প্রভাব হিসাব করে ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সকে আর্থিক মূল্যে রূপ দিয়েছে। সহজভাবে বললে, একজন ক্রিকেটারের প্রতিটি রান, প্রতিটি বল, ম্যাচে জয়ের সম্ভাবনায় কতটা প্রভাব ফেলেছে, সেই হিসাব থেকেই এই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এক নজরে বৈভবের আর্থিক হিসাব

  • রাজস্থানের খরচ: প্রায় ১.৪০ কোটি টাকা
  • মডেল অনুযায়ী মৌসুমের ইমপ্যাক্ট মূল্য: প্রায় ৪৪.৬৪ কোটি টাকা
  • মৌসুমের লাভ: প্রায় ৪৩.২৩ কোটি টাকা
  • রিটার্ন মাল্টিপল: ৩১.৭৯ গুণ
  • প্রতি ম্যাচে রাজস্থানের খরচ: প্রায় ৮.৮১ লাখ টাকা
  • এক ম্যাচে সর্বোচ্চ রিটার্ন: প্রায় ৬.৫৯ কোটি টাকা
  • মোট ১৬ ম্যাচের মধ্যে লাভজনক ম্যাচ: ১২টি
  • সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স টিয়ারের ম্যাচ: ৭টি

এই অঙ্কগুলো বোঝায়, রাজস্থানের জন্য বৈভব ছিলেন শুধু ভবিষ্যতের প্রতিভা না চলতি মৌসুমের সবচেয়ে কার্যকর বিনিয়োগগুলোর একজন। আইপিএল ২০২৬-এ মোট লাভের হিসাবে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তার ওপরে ছিলেন শুভমান গিল ও রজত পাটিদার। তবে পার্থক্য হলো, গিলের পেছনে বিনিয়োগ ছিল প্রায় ২১.০৬ কোটি টাকা এবং পাটিদারের পেছনে প্রায় ১৪.০৪ কোটি টাকা। সেখানে বৈভবের দাম ছিল মাত্র ১.৪০ কোটি টাকার কাছাকাছি।

গিলের মডেলভিত্তিক লাভ প্রায় ৪৪.৮৫ কোটি টাকা, পাটিদারের প্রায় ৪৪.৭৫ কোটি টাকা। বৈভবের লাভ প্রায় ৪৩.২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ উপরের দুইজনের চেয়ে তার লাভ খুব বেশি কম নয়, কিন্তু বিনিয়োগ ছিল অনেক কম।

বৈভবের মৌসুম তৈরি হয়েছে তার আগ্রাসী ব্যাটিংকে কেন্দ্র করে। ১৬ ম্যাচে করেছেন ৭৭৬ রান। এর মধ্যে ৫২১ রানই এসেছে পাওয়ারপ্লেতে। নতুন বল, ফিল্ডিং রেস্ট্রিকশন এবং তাজা বোলারদের বিপক্ষে প্রথম ছয় ওভারকে নিজের আক্রমণের জায়গা বানিয়েছিলেন তিনি।

সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিপক্ষে জয়পুরে ৩৬ বলে সেঞ্চুরি ছিল আইপিএল ইতিহাসের তৃতীয় দ্রুততম শতক। সেই ম্যাচে ৩৭ বলে ১০৩ রানের ইনিংসে মেরেছিলেন ১২ ছক্কা ও ৫ চার। এরপর এলিমিনেটরে একই দলের বিপক্ষে ২৯ বলে ৯৭ রান করেন। ৯০ বা তার বেশি রানের আইপিএল ইনিংসের মধ্যে সেটি ছিল সর্বোচ্চ স্ট্রাইক রেটের ইনিংস।

গুজরাট টাইটান্সের বিপক্ষে কোয়ালিফায়ার টুতেও ৪৭ বলে ৯৬ রান করেন বৈভব। সেদিন পিচ ছিল কিছুটা ধীর, রাজস্থানের ইনিংসও চাপে ছিল। আগের দুই ইনিংসের মতো শুধু ঝড় তোলা নয়, পরিস্থিতি বুঝে খেলার পরিণতিও দেখান তিনি। তবে টানা দ্বিতীয় নকআউট ম্যাচে সেঞ্চুরির কাছাকাছি গিয়ে থামতে হয় তাকে।

তার ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল পাওয়ারপ্লে নিয়ন্ত্রণ। মোট ৭৭৬ রানের মধ্যে ৫২১ রান প্রথম ছয় ওভারে করা শুধু বড় সংখ্যা নয়, টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংয়ের এক নতুন মানদণ্ডও। বোলারদের ওপর শুরু থেকেই চাপ তৈরি করে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়াই ছিল বৈভবের সবচেয়ে বড় শক্তি।

আরও একটি বিস্ময়কর তথ্য তার পুল শট নিয়ে। পুরো মৌসুমে পুল শটে ২০টি ছক্কা মেরেছেন তিনি। এই শটে ৩৬ বার চেষ্টা করে আউট হয়েছেন মাত্র একবার, স্ট্রাইক রেট ৪১৯.৪৪। মৌসুমে ৪৪ জন বোলারের মুখোমুখি হয়ে ৩১ জনকেই ছক্কা মেরেছেন বৈভব। আটজন বোলারকে প্রথম বলেই ছক্কা মেরেছেন তিনি।

এই কারণেই তার মূল্য শুধু রানসংখ্যায় আটকে নেই। কাস্টম মডেলের হিসাবে সাতটি ম্যাচে তার পারফরম্যান্স সর্বোচ্চ স্তরের ছিল, যেখানে একজন ক্রিকেটার ম্যাচের জয়ের সম্ভাবনা অস্বাভাবিকভাবে বদলে দেন। আবার খারাপ ম্যাচেও রাজস্থানের ক্ষতি ছিল কম। কারণ তার প্রতি ম্যাচের বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৮.৮১ লাখ টাকার মতো।

তুলনার জন্য বলা যায়, বৈভবের মডেলভিত্তিক লাভ প্রায় ৪৩.২৩ কোটি টাকা। এই অঙ্কটি ঋষভ পন্তের প্রায় ৩৪.৪৬ কোটি টাকার নিলামমূল্য, নিকোলাস পুরানের প্রায় ২৬.৮০ কোটি টাকা এবং যুজবেন্দ্র চাহাল ও জসপ্রিত বুমরাহর প্রায় ২২.৯৮ কোটি টাকার দামের চেয়েও বেশি।

আইপিএল ২০২৬-এ ২০৩ জন ক্রিকেটার মিলিয়ে মডেল অনুযায়ী মোট লিগ সারপ্লাস ছিল প্রায় ৩৭৫.৩১ কোটি টাকা। বৈভব একাই সেই সারপ্লাসের ১১.৫ শতাংশ অবদান রেখেছেন, অথচ মোট বেতন কাঠামোয় তার অংশ ছিল মাত্র ০.১০৭ শতাংশ।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন পরের নিলাম ঘিরে। ২০২৫ মেগা নিলামে আনক্যাপড ক্রিকেটার হিসেবে বৈভবকে ১.১০ কোটি রুপিতে পেয়েছিল রাজস্থান। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৩। ২০২৬ মৌসুমের পর সেই মূল্য আর আগের জায়গায় থাকবে না, সেটি প্রায় নিশ্চিত।

তার দুই মৌসুমের আইপিএল রেকর্ড এখন ১,০২৮ রান, গড় ৪৬.৭২, দুটি সেঞ্চুরি এবং ২৩০-এর ওপরে স্ট্রাইক রেট। এই পারফরম্যান্সের পর ভবিষ্যৎ নিলামে তার ভিত্তিমূল্যই যদি ১৫ থেকে ১৮ কোটি রুপির কাছাকাছি ধরা হয়, বাংলাদেশি মুদ্রায় সেটি দাঁড়াবে প্রায় ১৯.১৫ থেকে ২২.৯৮ কোটি টাকা। বাস্তবে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো আরও বেশি দাম তুলতে পারে।