logo
Advertisement

গাজীপুর/খাবার ও পোশাকে ফুল-ফলের রঙ, দুই নারীর চমক

রেজাউল করিম
গাজীপুর, ঢাকা
খাবার ও পোশাকে ফুল-ফলের রঙ, দুই নারীর চমক
ফুল ও ফলের রঙ থেকে তৈরি খাবার ও পোশাক। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কৃত্রিম ও রাসায়নিক রঙের নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে যখন উদ্বেগ বাড়ছে, ঠিক তখন প্রকৃতির উপাদানে নিরাপদ খাবার ও পরিবেশবান্ধব পোশাক তৈরির ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন গাজীপুরের দুই নারী উদ্যোক্তা তানিয়া পারভীন ও রাবেয়া খানম। ড্রাগন ফল, গাজর, অপরাজিতা ফুলসহ বিভিন্ন ফল, সবজি, গাছের পাতা এবং ফেলে দেওয়া প্রাকৃতিক উৎস থেকে রঙ সংগ্রহ করে তা কেক, পুডিং, আইসক্রিমসহ হরেক পদের খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সাথে কাপড় রঙ করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

নিরাপদ খাবারের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরির এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে বেশ আগ্রহ তৈরি করেছে। উদ্যোক্তাদের আশা, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও গবেষণার সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে খাদ্য ও পোশাক শিল্পে প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে। শুধু খাবারেই নয়, প্রাকৃতিক রঙের সঠিক ব্যবহার ছড়িয়ে দিতে কাপড়ের ক্ষেত্রেও কাজ করছেন এই দুই উদ্যোক্তা। বিভিন্ন ফল, ফুল, গাছের পাতা ও প্রাকৃতিক উপাদান থেকে সংগ্রহ করা নির্যাস দিয়ে কাপড় রঙ করা হচ্ছে; পাশাপাশি করা হচ্ছে ন্যাচারাল ডাইং ও ইকো প্রিন্ট।

ফুল থেকে তৈরি রঙ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
ফুল থেকে তৈরি রঙ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রাসায়নিক রঙের বিকল্প হিসেবে প্রকৃতির উপাদান ব্যবহার করে তৈরি এসব কাপড় যেমন নান্দনিক, তেমনি পরিবেশবান্ধব বলেও দাবি উদ্যোক্তাদের। তাদের ভাষ্য, প্রাকৃতিক উপাদানকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে একদিকে পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে ফেলে দেওয়া বিভিন্ন উপকরণও নতুন ও কার্যকর পণ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে।

উদ্যোক্তা তানিয়া পারভীন বলেন, বিভিন্ন প্রাকৃতিক উৎস—যেমন সবজি, ফল, ফুল ও গাছের পাতা থেকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে খাবার ও কাপড়ের রঙ তৈরি করছি। এ বিষয়ে খুলনার বিশুদ্ধ এগ্রো ইন্ডাস্ট্রি থেকে তিন দিন এবং কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ঢাকা আঞ্চলিক অফিস থেকে তিন দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েছি। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ঢাকা আঞ্চলিক অফিস থেকে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে ও বিনামূল্যে এই প্রশিক্ষণটি পেয়েছি। প্রশিক্ষণ শেষে চুলা, স্টিম মেশিন ও ব্লেন্ডারসহ প্রয়োজনীয় কিছু সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে, যা আমাদের কাজকে আরও দ্রুত ও সহজ করতে বেশ সহযোগিতা করছে।

তিনি আরও বলেন, চারদিকে যখন ভেজাল ও কৃত্রিম সিনথেটিক রঙের ছড়াছড়ি, তখন বিষয়টি মাথায় রেখেই আমরা এই উদ্যোগ গ্রহণ করি। মানুষের কাছ থেকে এখন বেশ ভালো সাড়াও পাচ্ছি। বিশেষ করে যারা স্বাস্থ্যসচেতন, তারা প্রাকৃতিক এসব পণ্য খুব ভালোভাবে গ্রহণ করছেন। বিভিন্ন সম্ভাব্য ক্রেতার কাছে আমরা বিনামূল্যে পণ্যের নমুনা পাঠাচ্ছি এবং তাদের মতামত নেওয়ার চেষ্টা করছি; তারা পণ্য ব্যবহার করে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন।

ফুল ও ফল থেকে সংগৃহীত রঙ ব্যবহার করা হচ্ছে কাপড়ে। ছবি: এশিয়া পোস্ট
ফুল ও ফল থেকে সংগৃহীত রঙ ব্যবহার করা হচ্ছে কাপড়ে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তবে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি হওয়ায় এসব খাবারের রঙের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে বলে জানান উদ্যোক্তা তানিয়া পারভীন। বিশেষ করে রঙ ও পণ্যের সংরক্ষণকাল বা ‘শেলফ লাইফ’ উন্নত করা নিয়ে এখনও কাজ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, নবজাতক থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত উপযোগী এসব পোশাক। সাধারণত প্রাকৃতিক রঙ তৈরির একটি বড় অংশ আসে ফেলে দেওয়া বিভিন্ন উপাদান থেকে; যার মধ্যে রয়েছে পেঁয়াজের খোসা, বিভিন্ন গাছের পাতা, ডাবের ডাব বা ডাবের ছাল, হরিতকি, খয়ের ও ডালিমের খোসাসহ নানা প্রাকৃতিক বস্তু। তবে প্রাকৃতিক রঙে তৈরি কাপড়ের স্থায়িত্বের জন্য কিছু বিশেষ পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। সঠিকভাবে যত্ন নিলে এসব কাপড় বছরের পর বছর অনায়াসে ব্যবহার করা সম্ভব।

আরেক উদ্যোক্তা রাবেয়া খানম বলেন, বাংলাদেশ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সহায়তায় কিছুদিন আগে আমরা একটি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি, যেখানে প্রাকৃতিক রঙ তৈরি করা শেখানো হয়। বিভিন্ন ফল, সবজি ও ফুল থেকে কীভাবে রঙ সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন খাবারে প্রয়োগ করা যায়, সেটি আমরা সেখান থেকেই শিখেছি। বাচ্চারা যেহেতু রঙিন খাবার বেশি পছন্দ করে, তাই শিশুদের জন্য এই প্রাকৃতিক রঙ পুরোপুরি নিরাপদ। আমরা বিভিন্ন ধরনের খাবার—যেমন কেক, পুডিং, আইসক্রিম, নাড়ু ও নানা ডেজার্ট আইটেমে, যেগুলোতে সাধারণ কৃত্রিম রঙ ব্যবহার করা হয়, সেগুলোতে প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করছি। এতে কোনো ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ নেই, তাই সবাই নিশ্চিন্তে এটি গ্রহণ করতে পারবেন।

ফুল ও ফলের রঙ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের খাবার। ছবি: এশিয়া পোস্ট
ফুল ও ফলের রঙ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের খাবার। ছবি: এশিয়া পোস্ট

এ বিষয়ে গাজীপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. গোলাম মর্তুজা বলেন, তারা যেসব পণ্য তৈরি করেছেন তা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক রঙের। এটি অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি পদক্ষেপ এবং এতে কোনো ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই; বরং এটি স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভালো। পরিবেশবান্ধব পণ্য ও খাবার তৈরিতে নারী উদ্যোক্তাদের এমন উদ্যোগ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ ধরনের কাজকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।