উচ্চ বেতনের প্রলোভন থেকে যুদ্ধের ময়দান, রাশিয়ায় গিয়ে ফিরলেন না মামুন

টিনের ভাঙা ঘরের সামনে উঠানে বসে কাঁদছিলেন রোকেয়া খাতুন ও তার পুত্রবধূ মহিমা আক্তার। চারপাশে জড়ো হয়েছেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। কারও মুখে সান্ত্বনার ভাষা নেই। চার মাস আগেও এই বাড়িতে ছিল বিদেশযাত্রার প্রস্তুতি ও স্বপ্ন—ছেলে বিদেশে গিয়ে ভালো বেতন পাবেন, ঋণ শোধ করবেন, ঘরের অবস্থা বদলাবেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়বেন। এখন সেই বাড়িতে অপেক্ষা শুধু একজনের লাশের।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার খারুয়া গ্রামের আল মামুন আর ফিরবেন না—এ কথা যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না তার মা ও স্ত্রী। ২৪ বছর বয়সী এই যুবক দেশে ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বিংয়ের কাজ করতেন। রাশিয়ায় ইলেকট্রিশিয়ানের চাকরি হবে, ভালো বেতন পাওয়া যাবে—এই আশাতেই গত ৭ মে দেশ ছাড়েন তিনি। সঙ্গে ছিলেন আরও প্রায় ৩০ বাংলাদেশি।
পরিবারের অভিযোগ, চাকরির কথা বলে তাদের রাশিয়ায় নেওয়ার পর কয়েক দিনের মধ্যেই রুশ সেনাবাহিনীর কাছে তুলে দেওয়া হয়। পরে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের পাঠানো হয় ইউক্রেন সীমান্তের যুদ্ধক্ষেত্রে। সেখানে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় মামুন নিহত হয়েছেন বলে তার সঙ্গে রাশিয়ায় যাওয়া ঝিনাইদহের রাজন হোসেন তার পরিবারকে জানিয়েছেন। তবে মামুন ঠিক কখন, কোথায় মারা গেছেন কিংবা তার মরদেহ কোথায় আছে—এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পায়নি পরিবার।
মামুন ছিলেন মৃত আবুল কাশেম ও রোকেয়া খাতুন দম্পতির একমাত্র ছেলে। তার সংসারে স্ত্রী মহিমা আক্তার, এক ছেলে ও পাঁচ মাস বয়সী এক মেয়ে রয়েছে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। বিদেশে গিয়ে দুই-তিন বছর কাজ করে ঋণ শোধ করবেন, এরপর বাড়িতে একটি ঘর করবেন—দেশ ছাড়ার আগে স্ত্রীকে এমনটাই বলেছিলেন মামুন।
মহিমা আক্তার বলেন, তার স্বামী যুদ্ধ করতে রাশিয়ায় যাননি। ইলেকট্রিকের কাজের কথা বলেই তাকে বিদেশে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ায় যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। স্বামীর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা সম্ভব হতো না। মুঠোফোনে অডিও বার্তা ও ছবি পাঠিয়ে যোগাযোগ রাখতেন মামুন।
যুদ্ধক্ষেত্রে থাকার সময় মামুন ভয় ও শঙ্কার কথাও স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন। একবার তিনি বলেছিলেন, তার মাথার ওপর দিয়ে ড্রোন ঘুরছে, কখন কী ঘটে বলা যায় না। সন্তানদের দেখে রাখার কথাও বলেছিলেন।
মহিমার ভাষ্য, ২৬ আগস্ট কোনোভাবে স্বামীর সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। প্রায় আট কিলোমিটার হেঁটে একটি এলাকায় গিয়ে ওয়াই-ফাই সংযোগ পাওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন মামুন। এর আগে ১৯ আগস্ট একটি অডিও বার্তাও পাঠিয়েছিলেন। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায়নি।
স্বামীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর মহিমার সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি কীভাবে সংসার চালাবেন। তার ভাষ্য, স্বামীই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এখন সন্তানদের দেখার মতো কেউ নেই। এর ওপর স্বামীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কেও তিনি কিছু জানেন না।
মামুনকে বিদেশে পাঠাতে পরিবারের প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। এর মধ্যে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেওয়া হয়। ধানের ওপর প্রায় চার লাখ টাকা দাদন নেওয়া হয়েছিল। বাকি টাকা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে ও গরু বিক্রি করে জোগাড় করা হয়।
ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর সময় মা রোকেয়া খাতুন ভেবেছিলেন, ছেলে আয় করে সংসারের অভাব ঘোচাবেন। এখন সেই ছেলে নেই, কিন্তু ঋণ রয়ে গেছে। সমিতির লোকজন টাকা চাইতে বাড়িতে আসছেন। নাতি-নাতনিদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটিই এখন তার দুশ্চিন্তা।
রোকেয়া খাতুন বলেন, একমাত্র ছেলে নিজের ভাগ্য বদলাতে এবং তাদের ভালো রাখতে বিদেশে গিয়েছিলেন। সাড়ে আট লাখ টাকা ঋণ করেছেন। এখন ছেলে নেই, ঋণ আছে। দুই নাতি-নাতনিকে কীভাবে বড় করবেন, তা তিনি জানেন না। ছেলেকে যারা চাকরির কথা বলে বিদেশে পাঠিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দিয়েছেন, তাদের বিচারও চান তিনি।
মামুনের সঙ্গে একই ফ্লাইটে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের রাজন হোসেন। তার ভাষ্য, ‘জাবাল-এ-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে ৭ মে ৩০ বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। তাদের ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সবার ভিসা, বিএমইটি কার্ড ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
৮ মে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর কয়েক দিন তাদের স্বাভাবিকভাবেই রাখা হয়। ১২ মে ব্যাংক কার্ড, সিম কার্ড ও কাজের অনুমতিপত্র দেওয়ার কথা বলে তাদের একটি চুক্তিতে সই করানো হয়। চুক্তিটি রুশ ভাষায় লেখা ছিল। ফলে সেখানে কী লেখা আছে, তারা বুঝতে পারেননি বলে জানান রাজন।
পরে তারা জানতে পারেন, সেটি ছিল রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চুক্তি। এরপর তাদের একটি সেনাক্যাম্পে নিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে।
রাজনের দাবি, ১২ জুন তাদের সবাইকে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। ১৪ জুন ড্রোন হামলা ও মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় তাদের দলের অন্তত ১৭ বাংলাদেশি নিহত হন। কেউ ড্রোন হামলায়, কেউ মাইন বিস্ফোরণে মারা যান বলে তিনি জানান। আরও কয়েকজনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
সেই হামলায় নিজেও আহত হন রাজন। তার ভাষ্য, মাথার ওপর ড্রোন ও বোমার বিস্ফোরণের পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে পালিয়ে ১৮ আগস্ট বাংলাদেশ দূতাবাসে যান। রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সহযোগিতায় ২৩ আগস্ট দেশে ফেরেন তিনি।
দেশে ফেরার পরও রাশিয়ায় থাকা সহযাত্রীদের খবর নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন রাজন। তাদের দলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একজন রুশভাষী কমান্ডার ছিলেন। ওই কমান্ডারের কাছ থেকেই তিনি মামুনের মৃত্যুর খবর পান।
রাজন জানান, তিনিই মামুনের পরিবারকে তার মৃত্যুর খবর দেন। মামুনকে রাশিয়ায় পাঠানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন তার খালা-শাশুড়ি মোসাম্মৎ কোবিলা আক্তার। তার দাবি, প্রায় দুই বছর আগে রাশিয়ায় পাঠানোর জন্য মামুনের কাগজপত্র দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পর ‘জাবাল-এ-নূর’ নামের এজেন্সির মাধ্যমে তার ভিসা হয়। এরপর ৭ মে তিনি রাশিয়ায় যান।
কোবিলা আক্তার বলেন, রাশিয়ায় যাওয়ার পর মামুনদের কাছ থেকে রুশ ভাষায় চুক্তিতে সই নেওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে তারা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করেন। বাংলাদেশিদের যুদ্ধে পাঠানো হবে না বলে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল বলে দাবি তার।
তার অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট এজেন্সি ও দালালদের মাধ্যমেই প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। তিনি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, ওই ৩০ বাংলাদেশিকে মাসে দেড় লাখ টাকা বেতনের চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল।
মামুনের পরিবার বলছে, তারা একাধিকবার সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করেছেন। এমনকি মামলা করার জন্য থানায় যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা মামুনের অবস্থান বা মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সমাধান পাননি।
এদিকে রাশিয়ায় উচ্চ বেতন ও সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের পাঠানোর অভিযোগে তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্ত করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জাবাল-এ-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডও রয়েছে বলে সরকারি তথ্যের বরাতে জানা গেছে।
নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত জানিয়েছেন, মামুনের মৃত্যুর বিষয়টি পরিবার মৌখিকভাবে জানিয়েছে। পরিবারকে লিখিত আবেদন দিতে বলা হয়েছে। আবেদন পাওয়ার পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রবাসী কল্যাণ শাখার মাধ্যমে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানানো হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।


-eb7774.jpg)

