logo
Advertisement

দুই বছরেও হয়নি দাম নির্ধারণ, গুদামে নষ্ট হচ্ছে ২০ কোটি টাকার ওষুধের কাঁচামাল

দুই বছরেও হয়নি দাম নির্ধারণ, গুদামে নষ্ট হচ্ছে ২০ কোটি টাকার ওষুধের কাঁচামাল
মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় হেলথকেয়ার কেমিক্যালসের কাঁচামাল তৈরির কারখানা। ছবি : এশিয়া পোস্ট

দুই বছর আগে আবেদন করেও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) থেকে মেলেনি দাম নির্ধারণের অনুমোদন। ফলে দেশে উৎপাদিত প্রায় ২০ কোটি টাকার ওষুধের কাঁচামাল বাজারে ছাড়তে পারছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। বিক্রি না হওয়ায় গুদামেই মেয়াদ পার হয়ে নষ্ট হতে বসেছে এসব কাঁচামাল।

দেশে প্রতি বছর ওষুধের কাঁচামালের চাহিদা ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। এর প্রায় ৯০ শতাংশই আসে চীন, ভারত ও ইউরোপের দেশগুলো থেকে। নীতি সহায়তা ও পরিকাঠামো পাওয়া গেলে দেশেই মোট চাহিদার অর্ধেক কাঁচামাল উৎপাদন সম্ভব বলে মনে করছেন এই খাতসংশ্লিষ্টরা। এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

ডিজিডিএ ও দেশের স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, একমি ল্যাবরেটরিজ ও হেলথকেয়ারের মতো প্রতিষ্ঠান নিজস্ব উদ্যোগে ও অতিরিক্ত খরচে জ্বালানি তেল ব্যবহার করে এপিআই (ওষুধ তৈরির কাঁচামাল) উৎপাদন শুরু করে।

এর মধ্যে একমি মন্টিলুকাস্ট ও অ্যাজিথ্রোমাইসিনসহ পাঁচটি কাঁচামাল বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করছে। কিন্তু দুই বছর ধরে ডিজিডিএ থেকে মূল্য অনুমোদন বা ‘প্রাইস সার্টিফিকেট’ না পাওয়ায় পণ্যগুলো বাজারে ছাড়তে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।

একমি ল্যাবরেটরিজের পরিচালক মতিউর রহমান সিনহা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানের এপিআই কারখানা করে উৎপাদনে গিয়েছি। ডিজিডিএ মহাপরিচালককে এনে দেখানোও হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালে আবেদন করা হলেও দুই বছর ধরে সরকারের কাছ থেকে কোনো দাম পাচ্ছি না। ফলে প্রায় ২০ কোটি টাকার কাঁচামাল বাজারে ছাড়তে না পেরে নষ্ট হওয়ার পথে। খুব অল্প সময়ে এগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। এই লোকসানের দায় কে নেবে?’

একই সংকটে পড়েছে হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হেলথকেয়ার কেমিক্যালস। প্রতিষ্ঠানটি তিনটি মলিকিউল বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের পাশাপাশি আরও চারটির দাম নির্ধারণের অনুমোদনের আবেদন জানিয়েছে। গ্যাসের অভাবে ব্যাকআপ হিসেবে জেনারেটরে মাসে ৬০ হাজার লিটার ডিজেল পুড়িয়ে উৎপাদন সচল রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে উৎপাদন খরচও অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

হেলথকেয়ার কেমিক্যালসের গবেষণা ও উন্নয়ন (এপিআই) বিভাগের প্রধান মো. লায়েক আলী খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তিনটি মলিকিউল বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের পাশাপাশি রোসুভাস্টাটিন ও মেটফরমিনসহ চারটি এপিআই পণ্য ইতিমধ্যে মূল্য নির্ধারণের অপেক্ষায় রয়েছে। জ্বালানি তেলে খরচ বেশি লাগলেও মূল্য নির্ধারণ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কিছু জানানো হয়নি।’

হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান নির্বাহী ও বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বাপি) মহাসচিব মো. হালিমুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘উৎপাদিত কাঁচামালের দাম নির্ধারণের জন্য ডিজিডিএকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে, বৈঠকও হয়েছে। তারা আশ্বাস দিলেও কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা দিচ্ছে না।’

২০৩১ সালের চ্যালেঞ্জ

দেশে প্রয়োজনীয় ২০০টি মূল কাঁচামালের মধ্যে এখন তৈরি হয় মাত্র ১০ থেকে ১৫টি। অন্যদিকে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পর ২০৩১ সাল থেকে ট্রিপস চুক্তির আওতায় আর আন্তর্জাতিক পেটেন্ট ছাড় পাবে না বাংলাদেশ। তখন বিপুল রয়্যালটি ছাড়া ওষুধ উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়বে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০৩১ সালের এই চ্যালেঞ্জ সামলাতে দেশে কাঁচামাল উৎপাদনের বিকল্প নেই। অথচ সরকারি আমলাতন্ত্রের জটিলতায় প্রস্তুত হওয়া কাঁচামালই আজ বাজারে নামতে পারছে না।

গ্যাস-বিদ্যুৎ নেই এপিআই শিল্পপার্কে

দেশীয় এপিআই খাতের অগ্রগতি বাড়াতে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় বিসিকের (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন) অধীনে এপিআই শিল্প পার্ক তৈরি করে সরকার। ৩৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই পার্কের ৪২টি প্লট ২০১৮ সালে উদ্যোক্তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও সেখানে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ মেলেনি। জেনারেটরের ডিজেলে উৎপাদন চালাতে গিয়ে বাড়ছে খরচ, যা আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশকে।

সরেজমিনে দেখা যায়, এপিআই পার্কে উন্নত ব্যবস্থাপনায় গ্যাসের লাইন যুক্ত করা হলেও তাতে সরবরাহ নেই। পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ থাকলেও তা কারখানা চালানোর মতো যথেষ্ট নয়। অযত্নে পড়ে আছে ৮০ কোটি টাকায় নির্মিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধন প্লান্ট (সিইটিপি)। নিরাপত্তা নিশ্চিতে সীমানাপ্রাচীরের বাইরে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেই। ৪২টি প্লটের অধিকাংশই খালি পড়ে আছে।

ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজমুল হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘অবকাঠামোগত ঘাটতি ও জেনারেটরের খরচের কারণে আমদানিকৃত পণ্যের চেয়ে দেশে উৎপাদিত কাঁচামালের খরচ বেশি পড়ে যাচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুতের পাশাপাশি প্রণোদনা না পেলে ভারত ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না।’

তিনি বলেন, ‘সরকার জমি দিয়ে দায় সেরেছে। কিন্তু এখানে নিরাপত্তাসহ আরও অনেক কিছু দরকার। বছরের পর বছর ধরে তাগিদ দিয়েও গুরুত্ব মেলেনি, যা বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছে; কেউ কেউ চলেও গেছেন। তবে বর্তমান সরকার কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বসেছে। আশা করি তারা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।’

নষ্টের পথে ৮০ কোটির বর্জ্য শোধনাগার

ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনে তৈরি হয় বিপজ্জনক রাসায়নিক বর্জ্য। পরিবেশের মান সুরক্ষায় শিল্প পার্কের সব কারখানার বর্জ্য শোধনের জন্য প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় সিইটিপি। এতে পৃথকভাবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ব্যয় কমার পাশাপাশি পরিবেশগত তদারকিও সহজ হওয়ার কথা।

নির্মাণের পর কোনো কারখানা পূর্ণাঙ্গভাবে উৎপাদনে না যাওয়ায় শোধনাগারটি এখন পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়নি। অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে এই স্থাপনা।

যা বলছে ওষুধ প্রশাসন

মূল্য নির্ধারণের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) পরিচালক আকতার হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় অবগত। দাম নির্ধারণে একটি উপদেষ্টা (অ্যাডভাইজারি) কমিটি এবং একটি মূল্য নির্ধারণ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যেই উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়েছে, মূল্য নির্ধারণ কমিটিও প্রক্রিয়াধীন। আইনগত কিছু জটিলতার কারণে সময় লেগেছে, কমিটি দুটি বসে দ্রুত এপিআইয়ের মূল্য নির্ধারণের মেকানিজম ঠিক করে ফেলবে।’