
বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দুই দিনের পশ্চিমবঙ্গ সফরের প্রথম দিন শনিবার (২০ জুন) হুগলির তারকেশ্বরে আয়োজিত সভায় দেওয়া ভাষণে এই কথা জানান তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও রাজ্যপাল রবীন্দ্র নারায়ণ রবি (আর. এন. রবি)।
মোদি বলেন, দশকের পর দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গকে অনুপ্রবেশকারীদের আখড়া বানিয়ে ফেলেছিল বাম, কংগ্রেস ও তৃণমূল। আপনারা দেখেছেন সীমান্তে ফেন্সিং (কাঁটাতারের বেড়া) দেওয়ার জন্য জমি হস্তান্তরের যে প্রক্রিয়া, বিগত রাজ্য সরকার দশকের পর দশক সেই প্রক্রিয়া আটকে রেখেছিল। কিন্তু নতুন সরকার আসতেই সেই কাজ শুরু হয়েছে। কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকাজ দ্রুত এগোচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, পরাধীন থাকাকালীন সময়ে পশ্চিমবঙ্গ অনেক অত্যাচার সহ্য করেছে, কত বলিদান দিয়েছে তার কোন শেষ নেই। ১৯৪৬ সালের কলকাতাতে হিংসা, নোয়াখালীর দাঙ্গায় অনেক নির্দোষ বাঙালি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজের মাতৃভূমি টুকরো হওয়া দেখেছে কিন্তু বাংলার অস্মিতা, পরিচয় নষ্ট হতে দেয়নি। ফলে যখন পুরো বাংলাকে ভারত থেকে আলাদা করার একটা ষড়যন্ত্র তৈরি হচ্ছিল। তখন পৃথক পশ্চিমবঙ্গ গঠন করে সেই চক্রান্ত ভেস্তে দিয়েছিল। এর ফলে হাজার বছরের ঐতিহ্য সংস্কৃতি পরম্পরা রক্ষা পেয়েছিল।
তিনি বলেন, বাংলা একসময় ভাঙন, বিভাজন ও রক্তপাত সহ্য করেছে। যখন পুরো বাংলাকে পাকিস্তানের অংশ করার চেষ্টা হচ্ছিল, তখন কংগ্রেস ওই ষড়যন্ত্রকারীদের সামনে আত্মসমর্পণ করেছিল। সেসময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় হিন্দুরা জমি পেয়েছেন। স্পষ্ট বলেছিলেন যে, পশ্চিমবঙ্গকে পাকিস্তানের অংশ করা যাবে না। ইতিহাসকে নষ্ট করার চেষ্টা করেছে কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গ দিবসকে ভোলানোর চেষ্টা করেছিল।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিজেপি সরকার করলে এই প্রথমবার সরকারিভাবে ২০ জুন দিনটি ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার পরিবর্তন নিয়ে মোদি বলেন, বাংলার বাতাসে এখন নতুন সুগন্ধ। সব বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে গেছে বাংলা, বাংলার গৌরব ফিরে আসা শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই অবিচারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন। তার আন্দোলনের ফলেই আজ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ। আজকের প্রজন্মকে বারবার এই ইতিহাস জানাতে হবে। প্রথমে কংগ্রেস, তারপর বাম এবং শেষে তৃণমূল, দশকের পর দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গকে অনুপ্রবেশকারীদের আখড়া বানিয়ে ফেলেছিল। বাংলায় তোষণের রাজনীতি শুরু করেছিল কংগ্রেসই।
রাজ্যে বিজেপি সরকার আসার পর পরিস্থিতি কীভাবে বদলেছে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুরানো সরকারের আমলে এখান থেকে শিল্পপতিরা পালিয়ে যাচ্ছিলেন, অনুপ্রবেশ বাড়ছিল। মানুষ একজোট হয়ে তৃণমূলকে সরিয়ে বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছে। এখন মানুষ নিজেদের অধিকার ফিরে পাচ্ছেন। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসতেই কথা রাখতে শুরু করেছে বিজেপি। এতদিন যে নৈরাজ্য চলছিল, তার পরিবর্তে বাংলায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে।
দুর্নীতি প্রসঙ্গে কড়া বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, যারা একসময় আপনাদের লুট করেছিল, তারাই এখন লুটের টাকা ফেরত দিচ্ছে। বড় বড় লুটেরাদের জেলে পাঠানো হচ্ছে। সিন্ডিকেট রাজ চালানো ব্যক্তিরা এখন ক্ষমা চাইছে। টোল প্লাজার তোলাবাজরা পালিয়েছে। বাংলায় কাটমানি রাজ এখন শেষ, আসল কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আপনারা দেখেছেন সীমান্তে ফেন্সিং (কাঁটাতারের বেড়া) দেওয়ার জন্য জমি হস্তান্তরের যে প্রক্রিয়া, বিগত রাজ্য সরকার দশকের পর দশক সেই প্রক্রিয়া আটকে রেখেছিল। নতুন সরকার হওয়ার পরেই সেই কাজ শুরু হয়েছে। এখন দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে।
আন্তর্জাতিক যোগ দিবস প্রসঙ্গে মোদি বলেন, এবার আমি পশ্চিমবঙ্গেই যোগ দিবস (২১ জুন) পালন করছি। আমি চাই বাংলার কোণে কোণে যেন যোগ দিবস পালিত হয়। আপনারা প্রত্যেকেই এই অনুষ্ঠানে অংশ নিন। এ সময় বক্তব্যের শেষে দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে তিনি বলেন, বাংলা এবার আর থামবে না, এবার ইতিহাস গড়বে বাংলা।
উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বাংলার প্রাদেশিক আইনসভায় পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত পাস হয়েছিল। এর নেপথ্যে অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালনের দিনক্ষণ নিয়ে রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্ক জারি ছিল। বিগত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে ‘১লা বৈশাখ’ দিনটিকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে পালন করা হত। তবে ক্ষমতার পালা বদলের পর বর্তমান সরকার স্থির করেছে যে, ২০ জুন দিনটিই হবে অফিশিয়াল ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’।