Advertisement

মায়ামি বিমানবন্দরে ১১ ঘণ্টা জেরা করা হয় সেই সোমালি রেফারিকে

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
মায়ামি বিমানবন্দরে ১১ ঘণ্টা জেরা করা হয় সেই সোমালি রেফারিকে
ওমর আবদুলকাদির আরতান। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ইতিহাস গড়ার কথা ছিল ওমর আবদুল কাদির আরতানের। প্রথম সোমালি রেফারি হিসেবে বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আগেই থেমে গেল সেই স্বপ্ন। মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১১ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরে তাকে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ফেরত পাঠানো হয়।

আফ্রিকার অন্যতম সেরা রেফারি হিসেবে পরিচিত আরতান ২০২৫ সালে কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবলের বর্ষসেরা পুরুষ রেফারি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ফিফার নির্বাচিত রেফারিদের তালিকাতেও ছিলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে হতে যাওয়া বিশ্বকাপে তার দায়িত্ব পাওয়া সোমালিয়ার ফুটবলের জন্য বড় অর্জন হিসেবেই দেখা হচ্ছিল।

কিন্তু মায়ামিতে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। মার্কিন কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন বা সিবিপি তাকে অতিরিক্ত যাচাইয়ের জন্য আটকে রাখে। পরে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। সিবিপি আনুষ্ঠানিকভাবে “vetting concerns” বা যাচাইসংক্রান্ত উদ্বেগের কথা বলেছে।

মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা পরে দাবি করেন, অতিরিক্ত যাচাইয়ের সময় আরতানের সঙ্গে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্যদের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সেই অভিযোগের নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে, কারণ আরতান নিজে বলেছেন, তার সব কাগজপত্র ও মার্কিন ভিসা ঠিক ছিল।

আরতান নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, মায়ামি বিমানবন্দরে তাকে ১১ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কেন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন, সোমালি রাজনীতি সম্পর্কে তার অবস্থান কী, এমনকি সন্ত্রাসী সংগঠন আল-শাবাব নিয়েও তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছে। তিনি কর্মকর্তাদের ফিফার কাগজপত্র এবং নিজের রেফারিং ক্যারিয়ারের ছবি দেখিয়েছিলেন বলেও জানান।

জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে একটি ডিটেনশন সেলে রাখা হয়। এরপর ইস্তাম্বুলগামী বিমানে তুলে দেওয়া হয়। আরতানের ভাষায়, তার মনে হয়েছে সমস্যাটি তার ব্যক্তিগত নয়, তার দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি বলেছেন, তার ধারণা, সমস্যাটি তার দেশকে ঘিরেই।

ফিফা পরে নিশ্চিত করেছে, আরতান আর ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রশিক্ষণ বা ম্যাচ পরিচালনায় অংশ নিতে পারবেন না। ফিফার বক্তব্য, আয়োজক দেশের অভিবাসন প্রক্রিয়া, ভিসা অনুমোদন বা প্রবেশের সিদ্ধান্তে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। কে ভিসা পাবে বা কে দেশে ঢুকতে পারবে—শেষ পর্যন্ত সেটি আয়োজক সরকারের সিদ্ধান্ত।

এই অবস্থান নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। কারণ আরতান শুধু একজন সাধারণ ভ্রমণকারী নন; তিনি ফিফা নির্বাচিত ম্যাচ অফিসিয়াল। বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে দায়িত্ব পালনের জন্যই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছিলেন। তাঁর প্রবেশ আটকে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠছে, আয়োজক দেশ ও ফিফার মধ্যে অংশগ্রহণকারীদের প্রবেশাধিকার নিয়ে নিশ্চয়তার বাস্তব মূল্য কতটা।

সোমালিয়ার ক্রীড়া কর্তৃপক্ষ আরতানের পাশে দাঁড়িয়েছে। দেশটির কর্মকর্তারা বলেছেন, আরতানের আন্তর্জাতিক অর্জন সোমালি জনগণের জন্য গর্বের। সোমালি ফুটবল ফেডারেশনও জানিয়েছে, তারা আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পায়নি এবং ফিফা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছে।

আরতানের ক্যারিয়ারও কম উল্লেখযোগ্য নয়। ২০১৮ সাল থেকে তিনি ফিফা তালিকাভুক্ত রেফারি। সোমালিয়ার ঘরোয়া ফুটবল থেকে উঠে এসে আফ্রিকার বড় মঞ্চে দায়িত্ব পালন করেছেন। আফ্রিকা কাপ অব নেশনস ও সিএএফ চ্যাম্পিয়নস লিগে ম্যাচ পরিচালনা করে তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। এমন একজন রেফারির বিশ্বকাপ থেকে এভাবে ছিটকে যাওয়া তাই শুধু ব্যক্তিগত ধাক্কা নয়, সোমালি ফুটবলের জন্যও বড় হতাশা।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, বিষয়টি নিরাপত্তাজনিত। তাঁদের বক্তব্য, পেশা বা পরিচয় যাই হোক, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবার জন্য একই আইন প্রযোজ্য। কেউ নিরাপত্তা যাচাইয়ে উত্তীর্ণ না হলে তাঁকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না।

তবে সমালোচকদের প্রশ্ন অন্য জায়গায়। যদি একজন ফিফা-নির্বাচিত রেফারি বৈধ ভিসা ও টুর্নামেন্টের কাগজপত্র নিয়েও প্রবেশ করতে না পারেন, তাহলে বিশ্বকাপের অন্তর্ভুক্তি ও ন্যায্যতার প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর? বিশেষ করে সোমালিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ বিধিনিষেধে থাকা দেশগুলোর একটি হওয়ায় এই ঘটনা আরও রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে।

বিশ্বকাপ শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ও প্রবেশনীতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। ইরান দলের কর্মকর্তা, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সমর্থক, কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের ভিসা জটিলতা নিয়ে আগেই আলোচনা ছিল। আরতানের ঘটনা সেই বিতর্ককে আরও বড় করেছে।

ওমর আরতান আপাতত বিশ্বকাপ হারালেন। কিন্তু তাঁর ঘটনা বিশ্বকাপের মাঠের বাইরের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি সামনে এনে দিয়েছে—ফুটবলের বৈশ্বিক মঞ্চে জায়গা পাওয়া কি যথেষ্ট, নাকি শেষ সিদ্ধান্ত এখনো সীমান্তের দরজায়?