ইয়ামালের প্রথম বিশ্বকাপ গোলে খরা কাটাল স্পেন

বিশ্বকাপে স্পেনের গোলের অপেক্ষা শেষ করলেন লামিনে ইয়ামাল। সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচের ১০ মিনিটে গোল করে শুধু নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোলই পেলেন না, ভাঙলেন স্পেনের ২৯৯ মিনিটের গোলখরাও। আটলান্টায় তার গোলেই খুলে যায় স্পেনের তালা।
ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন বিশ্বকাপ শুরু করেছিল কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র দিয়ে। বলের দখল, পাসিং, আক্রমণ, সব ছিল, শুধু গোল ছিল না। সেই হতাশার পর সৌদি আরবের বিপক্ষে শুরু থেকেই দ্রুত বল চালানোর পরিকল্পনা নিয়ে নামে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। ম্যাচের ১০ মিনিটেই তার ফল পায় তারা।
মিকেল ওয়ারসাবালের নিচু ক্রস থেকে গোল করেন ইয়ামাল। সৌদি রক্ষণ তখন স্পেনের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছিল। ডান প্রান্ত থেকে দৌড়ে এসে দূরের পোস্টে স্লাইড করে বল জালে পাঠান ১৮ বছর বয়সী বার্সেলোনা উইঙ্গার। ঠান্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে তিনি করেন নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল।
এই গোলের গুরুত্ব শুধু স্কোরলাইনে নয়, ইতিহাসেও। ২০২২ বিশ্বকাপে জাপানের বিপক্ষে আলভারো মোরাতার গোলের পর বিশ্বকাপে আর গোল পায়নি স্পেন। সেই ম্যাচে ১১ মিনিটে গোল করেছিলেন মোরাতা। এরপর কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর বিপক্ষে গোলশূন্য ১২০ মিনিট, এবারের বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ৯০ মিনিট এবং সৌদি আরব ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিট, সব মিলিয়ে ২৯৯ মিনিট পর বিশ্বকাপে গোল পেল স্পেন।
স্পেনের বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটি ছিল তাদের সবচেয়ে দীর্ঘ গোলখরা। তাই ইয়ামালের গোল শুধু একজন তরুণের ব্যক্তিগত মাইলফলক নয়, পুরো দলের চাপ কাটানোর মুহূর্তও। কেপ ভার্দের বিপক্ষে ব্যর্থতার পর স্পেনের আক্রমণ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল, সেটির প্রথম উত্তর এল ইয়ামালের পা থেকে।
চোট কাটিয়ে এই ম্যাচে শুরুর একাদশে ফিরেছিলেন ইয়ামাল। প্রথম ম্যাচে তিনি পুরো ফিট ছিলেন না, বদলি হিসেবে খেলেছিলেন। সৌদি আরবের বিপক্ষে শুরু থেকেই তার উপস্থিতি স্পেনের আক্রমণের চেহারা বদলে দেয়। ডান দিক থেকে ভিতরে ঢোকা, দ্রুত পাস, এক-এক লড়াইয়ে রক্ষণ ভাঙা, সব মিলিয়ে স্পেনের খেলা অনেক বেশি ধারালো দেখায়।
ইয়ামালের গোলের পর স্পেন আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। ২১ ও ২৪ মিনিটে জোড়া গোল করেন ওয়ারসাবাল। বিরতির আগেই ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্পেন। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে হাসান আল-তামবাকতির আত্মঘাতী গোলে ব্যবধান হয় ৪-০। সৌদি আরবের রক্ষণ বারবার স্পেনের গতির সামনে ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত এই ব্যবধানেই প্রথম ম্যাচের হতাশা কাটায় স্পেন।
ইয়ামালের জন্য রাতটি বিশেষ। ১৮ বছর বয়সেই তিনি ইউরো জিতেছেন, স্পেনের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় ও গোলদাতার রেকর্ড গড়েছেন, ইউরোতে সবচেয়ে কম বয়সে গোল ও অ্যাসিস্টের ইতিহাস লিখেছেন। এবার সেই তালিকায় যোগ হলো প্রথম বিশ্বকাপ গোল।
স্পেনের হয়ে এটি ইয়ামালের সপ্তম গোল। জাতীয় দলের হয়ে তার ম্যাচ সংখ্যা এখন ২৭। বয়সের তুলনায় এই সংখ্যাই বলে দেয়, স্পেন তাকে শুধু ভবিষ্যতের খেলোয়াড় হিসেবে দেখছে না; তিনি বর্তমান দলেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
তবে স্পেন তাকে নিয়ে সতর্ক। চোট থেকে ফেরার পর তাকে পুরো ম্যাচ খেলানো হয়নি। বিরতিতেই তাকে তুলে নেওয়া হয়, যাতে ধীরে ধীরে পুরো ফিটনেসে ফিরতে পারেন। বিশ্বকাপ লম্বা টুর্নামেন্ট, আর স্পেন জানে ইয়ামালকে পুরো পথের জন্য দরকার।
স্পেনের জন্য এই গোল আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোল করতে না পারায় তাদের খেলার ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। অতিরিক্ত পাসিং, বক্সে ধার কম, এক-এক লড়াইয়ে বিপক্ষকে না ভাঙতে পারা, এসব সমালোচনা শুনতে হয়েছিল। ইয়ামাল শুরুর একাদশে ফিরতেই সেই একঘেয়ে ভাব কেটে যায়।
দে লা ফুয়েন্তে আগেই বলেছিলেন, ইয়ামালকে মেসি বা ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়। তাকে নিজের পথ তৈরি করতে দিতে হবে। সৌদি আরবের বিপক্ষে গোলটি সেই পথেরই আরেকটি বড় ধাপ। বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের নাম লিখে ফেললেন তিনি।
স্পেনের বিশ্বকাপ অভিযান এখন নতুন করে শুরু হলো বলাই যায়। কেপ ভার্দের বিপক্ষে ধাক্কার পর সৌদি আরবের বিপক্ষে বড় জয়, ইয়ামালের ফেরা, ওয়ারসাবালের জোড়া গোল, সব মিলিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল ইউরো চ্যাম্পিয়নরা।
আর ইয়ামাল? তিনি আবারও দেখালেন, বয়স তার ক্ষেত্রে শুধু একটি সংখ্যা। বড় মঞ্চে, বড় চাপের মুহূর্তে, দলের গোলখরা ভাঙার দায়িত্ব তিনি নিতে পারেন। স্পেনের ২৯৯ মিনিটের অপেক্ষার শেষ হলো তার পায়ে। বিশ্বকাপে তার নিজের গল্পও শুরু হলো সেখান থেকেই।






