প্রতিদিন কলা খেলে শরীরে কী ঘটে জানেন কি

ছোটবেলা থেকেই অনেকেই শুনে এসেছেন, প্রতিদিন একটি আপেল খেলে নাকি ডাক্তার থেকে দূরে থাকা যায় (An apple a day keeps the doctor away)। তবে পুষ্টিবিদদের মতে, কলাও কিন্তু সমানভাবে গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য একটি ফল।
সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর কলা প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যোগ করলে শরীর নানা ধরনের উপকার পেতে পারে। বিশেষ করে এটি শক্তি জোগানো, হজম ভালো রাখা এবং শরীরের গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ঘাটতি পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
তাহলে প্রতিদিন একটি কলা খেলে আপনার শরীরে ঠিক কী ঘটে, চলুন জেনে নিই।
শরীরে বাড়ে শক্তি
কলা কার্বোহাইড্রেটের একটি ভালো উৎস। এই কার্বোহাইড্রেট শরীরকে ধীরে ধীরে শক্তি সরবরাহ করে, ফলে দীর্ঘ সময় কর্মক্ষম থাকা সহজ হয়। সকালের নাশতা বা ব্যায়ামের আগে অনেকেই কলা খেতে পছন্দ করেন, কারণ এটি দ্রুত শক্তি জোগাতে সাহায্য করে।
পটাশিয়ামের ভালো উৎস
কলার সবচেয়ে পরিচিত পুষ্টিগুণগুলোর একটি হলো এর পটাশিয়াম। একটি মাঝারি আকারের কলায় সাধারণত ৩৬০ থেকে ৫০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পটাশিয়াম থাকতে পারে। এই খনিজ শরীরের তরল ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যারা নিয়মিত বেশি লবণযুক্ত খাবার খান, তাদের জন্য পটাশিয়াম বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে। কারণ এটি শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম বের করে দিতে সাহায্য করে।
ফোলাভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে
অতিরিক্ত সোডিয়ামের কারণে অনেক সময় শরীরে পানি জমে যায়, ফলে ফোলাভাব বা সাময়িক ওজন বৃদ্ধি দেখা দিতে পারে। পুষ্টিবিদদের মতে, কলার পটাশিয়াম এই সমস্যার প্রভাব কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে। এ কারণে অনেকেই নিয়মিত কলা খাওয়ার পর শরীরকে তুলনামূলক হালকা অনুভব করেন।
পেশির খিঁচুনি কমানোর সম্ভাবনা
যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন বা শারীরিক পরিশ্রম বেশি করেন, তাদের জন্য কলা উপকারী হতে পারে। কলায় থাকা পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে পেশিতে টান ধরা বা খিঁচুনির ঝুঁকি কমতে পারে।
হজমে সহায়ক
কলায় রয়েছে খাদ্যআঁশ বা ফাইবার, যা হজম প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া কলা পেটের জন্য তুলনামূলকভাবে কোমল একটি খাবার। পেট খারাপ, বদহজম বা হালকা গ্যাস্ট্রিক সমস্যার সময়ও অনেক ক্ষেত্রে এটি সহজে হজম হয়।
এই কারণেই পেটের কিছু সমস্যার পর সুস্থ হয়ে ওঠার সময়ে সহজপাচ্য খাবারের তালিকায় কলা রাখা হয়।
মন ভালো রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে
কলায় প্রাকৃতিকভাবে সেরোটোনিন ও ট্রিপটোফ্যান নামের কিছু উপাদান থাকে। এসব উপাদান শরীরের স্বাভাবিক মানসিক সুস্থতা ও ঘুমের চক্রকে সমর্থন করতে সাহায্য করতে পারে। যদিও শুধু কলা খেয়েই মানসিক সমস্যা দূর হবে না, তবে এটি একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।
দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে
কলায় থাকা ফাইবার এবং কার্বোহাইড্রেট দীর্ঘ সময় তৃপ্তি অনুভব করতে সাহায্য করে। ফলে ঘন ঘন ক্ষুধা লাগার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে এবং অপ্রয়োজনীয় খাবার খাওয়ার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক
কলার পাকার মাত্রার ওপর এর চিনির পরিমাণ কিছুটা নির্ভর করে। কম পাকা কলায় সাধারণত তুলনামূলক কম চিনি থাকে এবং এতে রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ বেশি থাকে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা কিছুটা কম হতে পারে।
আরও যেসব উপকার মিলতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত কলা খাওয়া নিচের ক্ষেত্রগুলোতেও উপকারী হতে পারে-
- উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করা
- রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সমর্থন করা
- হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করা
- চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হওয়া
- শরীরের প্রদাহজনিত প্রক্রিয়া কমাতে ভূমিকা রাখা
কিছু গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কলায় থাকা কিছু জৈব সক্রিয় উপাদান স্তন, কোলোরেক্টাল এবং লিউকেমিয়ার মতো কিছু ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সুরক্ষামূলক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সবার জন্য কি প্রতিদিন কলা খাওয়া নিরাপদ
বেশিরভাগ সুস্থ মানুষের জন্য প্রতিদিন একটি কলা খাওয়া নিরাপদ এবং উপকারী হতে পারে। তবে যাদের কিডনির নির্দিষ্ট কিছু রোগ রয়েছে অথবা যাদের পটাশিয়াম গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, তাদের ক্ষেত্রে নিয়মিত বেশি কলা খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রতিদিন একটি কলা খাওয়া শরীরের জন্য অনেক উপকার বয়ে আনতে পারে। এটি শক্তি জোগায়, হজম ভালো রাখতে সাহায্য করে, পটাশিয়ামের চাহিদা পূরণে সহায়ক হয় এবং সামগ্রিক সুস্থতায় ভূমিকা রাখে।
তবে শুধু কলার ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ধরনের ফল ও পুষ্টিকর খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা সবচেয়ে ভালো। বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাদ্যাভ্যাসই সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি।
সুত্র: ডেলিশ








