কুমিরও থাকুক, নিরাপত্তাও নিশ্চিত হোক—দাবি বাগেরহাটবাসীর

এশিয়া পোস্ট নিউজ, বাগেরহাট
কুমিরও থাকুক, নিরাপত্তাও নিশ্চিত হোক—দাবি বাগেরহাটবাসীর
ছবি: এশিয়া পোস্ট

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খান জাহান আলী (রহ.) মাজারসংলগ্ন দিঘিতে কুমিরের আক্রমণে নিহত সাত বছর বয়সি শিশু ফাতেমা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় শোকাহত স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে তারা কুমির অপসারণের পরিবর্তে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে ঐতিহ্যবাহী কুমিরগুলো সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।

Advertisement

মঙ্গলবার (২ জুন) ভোরে দিঘির মহিলা ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে মাজারের খাদেম ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ফাতেমার মরদেহ উদ্ধার করেন। এর আগে সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মাজারসংলগ্ন দিঘির পূর্ব পাশের নারীঘাটে গোসল করতে নামলে একটি কুমির তাকে টেনে নিয়ে যায়।

ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা নৌকা নিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। রাতভর তল্লাশির পর ভোরে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৮ এপ্রিল একই দিঘিতে কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুর মারা যাওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এরপরও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার না হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে।

তবে স্থানীয়দের বড় একটি অংশ মনে করেন, শত বছরের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দিঘির কুমিরগুলো সংরক্ষণ করা উচিত। পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, খান জাহান আলী (রহ.) মাজারের কুমির আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এগুলো সরিয়ে ফেলা সমাধান নয়। বরং ঘাটে নিরাপত্তা বেড়া, সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড এবং পর্যাপ্ত নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে।

মাজারে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী শাহিদা বেগম বলেন, শিশু ফাতেমার মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক। ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা না ঘটে, সে জন্য নিরাপদ ঘাট নির্মাণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। কুমিরও থাকবে, আবার মানুষও নিরাপদ থাকবে-এমন ব্যবস্থা চাই।


স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. জাহিদুল হক বলেন, নির্যাতনের অনেক পর্যটক শুধু এই কুমির দেখার জন্য মাজারে আসেন। তাই ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থে কুমির সংরক্ষণ জরুরি। একই সঙ্গে কুমিরগুলোর জন্য নিয়মিত খাদ্যের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা দরকার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, মাজারে মানত হিসেবে অনেক গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি আসে। কিন্তু সেগুলোর বেশিরভাগই কুমিরকে খাওয়ানো হয় না। নিয়মিত ও পর্যাপ্ত খাবার না পেলে কুমিরগুলো স্বাভাবিকভাবেই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। কিছুদিন আগেও একটি কুকুরকে কুমির আক্রমণ করে মেরে ফেলেছিল। তাই কুমিরগুলোর জন্য সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

আরেক বাসিন্দা মো. আলাউদ্দিন শেখ বলেন, মানুষের নিরাপত্তা সবার আগে। কিন্তু কুমির সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে আমি নই। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে এমন ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে আর কোনো প্রাণহানি না ঘটে।

এদিকে মাজারের খাদেমরাও কুমির সংরক্ষণের পক্ষে মত দিয়েছেন। মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তরিকুল ইসলাম বলেন, এই কুমিরগুলো কয়েকশ বছরের ঐতিহ্যের অংশ। যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে কুমির সংরক্ষণ করা সম্ভব।

অন্যদিকে, মাজারের দিঘিতে কুমির রাখা হবে কি না, সে বিষয়ে আগামী দুই দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয় অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। সবার মতামত বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী খান জাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘির কুমিরকে ঘিরে ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও জননিরাপত্তার প্রশ্ন এখন নতুন করে সামনে এসেছে। ফাতেমার মৃত্যুর ঘটনায় শোকাহত মানুষ এখন এমন একটি সমাধান চান, যেখানে ঐতিহ্যও রক্ষা পাবে, আবার দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।