মহাসড়কের পাশে বর্জ্যের স্তূপ, দুর্ভোগ চরমে

এশিয়া পোস্ট নিউজ, ফেনী
মহাসড়কের পাশে বর্জ্যের স্তূপ, দুর্ভোগ চরমে
ছবি: এশিয়া পোস্ট

ফেনীতে অপরিকল্পিত বর্জ্য অপসারণ ও ডাম্পিং স্টেশনের অভাবে মহাসড়কের পাশ ও জনবহুল লোকালয়গুলো এখন ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ফেনী-নোয়াখালী জাতীয় মহাসড়কসহ বিভিন্ন উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার পাশে উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য ফেলায় একদিকে যেমন ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ ও শতবর্ষী বৃক্ষ, অন্যদিকে তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন লাখো মানুষ। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও আন্দোলনের পরও মিলছে না কোনো স্থায়ী সমাধান।

Advertisement

সরেজমিন জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী পৌরসভার রামপুর ও বিসিক এলাকার দুপাশে দীর্ঘদিন ধরে ফেলা হচ্ছে পৌরসভার আবাসিক বর্জ্য। মহাসড়কের ঢাকামুখী ও চট্টগ্রামমুখী লেনের বিভিন্ন অংশে দিন দিন বর্জ্যের স্তূপ বেড়েই চলেছে। এই বর্জ্যের উৎকট গন্ধ থেকে বাঁচতে স্থানীয়রা প্রায়ই সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের উত্তাপ ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় মহাসড়কের পাশের অন্তত ১৫-২০টি গাছ পুড়ে কঙ্কালসার হয়ে মরে গেছে।

বিষয়টি নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মাঝে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করলেও সড়ক ও জনপথ বিভাগ বা সামাজিক বন বিভাগের কোনো কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।

এ ছাড়া সোনাগাজী পৌরসভার বর্জ্য মতিগঞ্জ ইউনিয়নের ঘনবসতিপূর্ণ সুজাপুর ও ভাদাদিয়া গ্রামে ফেলার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় জনতা। সম্প্রতি সোনাগাজী-ফেনী আঞ্চলিক সড়কের সাদেকের টেক এলাকায় শতাধিক বাসিন্দা প্ল্যাকার্ড হাতে এক বিশাল মানববন্ধন করেন।

তাদের দাবি, জনবসতিপূর্ণ ফেনী-সোনাগাজী সড়কের এই স্থানে ময়লা ফেলার কারণে চারদিকে তীব্র দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব এবং বিষাক্ত বায়ুর সৃষ্টি হচ্ছে; ফলে শিশু ও বৃদ্ধরা প্রতিনিয়ত অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর নির্বাচনি এলাকায় এমন পরিবেশ বিপর্যয় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

পৌরসভার নিজস্ব জায়গা না থাকায় সাময়িকভাবে খাস জমিতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে জানিয়ে সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিগ্যান চাকমা বলেন, পরিবেশমন্ত্রীর ডিও লেটার নিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রায় দেড় একর জমি ক্রয়ের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এটি অনুমোদন হলে দ্রুত স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে।

এ ছাড়া দাগনভূঞার ফেনী-নোয়াখালী জাতীয় মহাসড়কের দাগনভূঞা পৌরসভার কৃষ্ণরামপুর (৭ নম্বর ওয়ার্ড) এলাকাসহ ইকবাল মেমোরিয়াল সরকারি ডিগ্রি কলেজ রোড, ভাষা শহীদ সালাম মেমোরিয়াল কলেজ ও উপজেলা ডাকঘরের সামনে অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। গত তিন বছর ধরে এই উন্মুক্ত স্থানে ময়লা ফেলার কারণে এটি এখন স্থায়ী ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বর্ষাকালে এই দুর্গন্ধ আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে। এখানে ময়লা পোড়ানোর ধোঁয়া এবং বাতাসে ছড়ানো জীবাণুর কারণে স্থানীয়দের মাঝে দাউদ, একজিমা, চুলকানিসহ মারাত্মক চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানির প্রকোপ দেখা দিয়েছে। এমনকি ভাগাড়ের পাশে বসবাসরত বেদে পরিবারগুলো চরম অমানবিক জীবনযাপন করছে। দুর্গন্ধ এড়াতে এই স্থানে চালকরা গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেওয়ায় একাধিকবার সড়ক দুর্ঘটনাও ঘটেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. শাহীদুল ইসলাম বলেন, রাস্তার পাশে বাধ্য হয়েই ময়লা ফেলতে হচ্ছে। তবে একটি ডাম্পিং স্টেশন করার জন্য কয়েকটি জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্রুতই কাজ শুরু হবে। আপাতত সেখানে জীবাণুনাশক ও ব্লিচিং পাউডার ছিটানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একই চিত্র দেখা গেছে ছাগলনাইয়া পৌরসভাতেও। পূর্ব ছাগলনাইয়া বিদ্যুৎ অফিস থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে এবং শহীদ আবদুর রাজ্জাক সড়কের প্রধান ডাকঘর এলাকায় কোনো ডাস্টবিন না থাকায় সড়কের ওপরই শত শত বাসাবাড়ির উচ্ছিষ্ট ফেলা হচ্ছে। পলিথিনে মোড়ানো বর্জ্য পুরো রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করা হাজারো শিক্ষার্থী, পথচারী এবং সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে আসা মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দাগনভূঞা বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি আবুল কায়েশ রিপন জানান, আমাদের মাতুভূঞা বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভার বর্জ্যসমূহ ফেলা হচ্ছে। যার কারণে এ অঞ্চলের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, মানুষজন বিভিন্ন অসুখ-বিসুখে ভুগছেন। তা ছাড়া এসব বর্জ্য ছোট ফেনী নদীতে গিয়ে পড়ে নদী দূষণ করছে। এ বিষয়ে সরকার আশু পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করছি।

ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. রুবাইয়াত বিন করিম এশিয়া পোস্টকে জানান, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার পাশাপাশি বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম ও অকাল গর্ভপাতের মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।

এ নিয়ে জানতে চাইলে ফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হক জানান, ফেনীর বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য ফেলা নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যা রয়েছে। বাস্তবিক অর্থে স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন না থাকার কারণে সড়ক-মহাসড়কের পাশে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, যা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। আমি এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখব, যাতে পৌরসভাগুলোর জন্য দ্রুত স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন স্থাপন করা হয়।