টেলিগ্রামে পর্নোগ্রাফির হাট, বিক্রি হয় মেম্বারশিপ

মোবাইল ফোনে কয়েকটি ক্লিক, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কয়েকশ টাকা পরিশোধ, এরপর একটি গোপন টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রবেশাধিকার- এভাবেই পরিচালিত হচ্ছে অনলাইন পর্নোগ্রাফির নতুন এক ব্যবসা। উন্মুক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নজরদারি এড়িয়ে টেলিগ্রামের গোপন গ্রুপ ও চ্যানেলকে ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে বিশাল এক নেটওয়ার্ক, যেখানে অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হচ্ছে অশ্লীল ও আপত্তিকর কনটেন্ট।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে এমন একাধিক টেলিগ্রাম চ্যানেলের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে সদস্য সংগ্রহের জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। এসব বিজ্ঞাপনে দাবি করা হচ্ছে, হাজার হাজার ভিডিও, নিয়মিত আপডেট এবং বিশেষ ‘ভিআইপি’ কনটেন্ট দেখার সুযোগ মিলবে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে।
এই প্রতিবেদকের হাতে আসা কয়েকটি স্ক্রিনশটে দেখা যায়, একটি টেলিগ্রাম চ্যানেল বিভিন্ন মেয়াদের সদস্যপদের বিনিময়ে অর্থ দাবি করছে। এক মাস থেকে শুরু করে আজীবন সদস্যপদ পর্যন্ত বিভিন্ন প্যাকেজের প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
অন্য একটি কথোপকথনের স্ক্রিনশটে দেখা যায়, নির্দিষ্ট একটি কনটেন্টের মূল্য নির্ধারণ করে অর্থ পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থ পাঠানোর পর স্ক্রিনশট বা লেনদেনের তথ্য দিতে বলা হয়েছে। পরে ‘অ্যাক্সেস’ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
সেই স্ক্রিনশটের সূত্র ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় টেলিগ্রামে পর্নোগ্রাফির হাটের ওই চক্রদের সঙ্গে, তারা বিভিন্ন মেয়াদী সদস্যপদ দিতে তিনটি নম্বরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা দেওয়ার কথা বলে। এরপর পেমেন্ট করে স্ক্রিনশট দিয়ে গ্রাহকের চার ডিজেটের নম্বর চাওয়া হয়। তারপর দেওয়া হয় পর্নোগ্রাফি হাটের এক্সসেস। সেই গ্রুপে প্রবেশ করার পর দেখা যায়, অধিকাংশ ভিডিও স্কুল-কলেজের উঠতি বয়সী মেয়েদের। এই চক্রটি অর্থের বিনিময়ে সেই ভিডিওগুলো কিনে নিচ্ছে অথবা বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমের আইডি হ্যাক করে এসব ভিডিও হাতিয়ে নিচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রথমে বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, মেসেঞ্জার গ্রুপ, টিকটক অ্যাকাউন্ট বা টেলিগ্রামের উন্মুক্ত চ্যানেলের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করা হয়। এরপর তাদের একটি গোপন গ্রুপে প্রবেশের প্রস্তাব দেওয়া হয়। অর্থ পরিশোধের পর ব্যবহারকারীকে যুক্ত করা হয় এমন চ্যানেলে, যেখানে হাজার হাজার ভিডিও, ব্যক্তিগত ছবি, কথিত ভাইরাল কনটেন্ট এবং বিভিন্ন আপত্তিকর ফাইল সংরক্ষিত থাকে। কিছু ক্ষেত্রে এসব কনটেন্টের সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগও থাকে না।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত কিছু টেলিগ্রাম নেটওয়ার্কে অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা অশ্লীল ছবি বিক্রির ঘটনাও ঘটছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের পদ্ধতি মূলত সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক অবৈধ কনটেন্ট ব্যবসার পরিচিত কৌশল। টেলিগ্রামের চ্যানেলভিত্তিক কাঠামো অবৈধ কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিষিদ্ধ বা অবৈধ কনটেন্টভিত্তিক চ্যানেলগুলো বন্ধ হয়ে গেলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যে নতুন নামে আবার চালু হয়ে যায়। এ ছাড়া কিছুদিন পরপর নতুন নতুন গ্রুপ খুলে সদস্যপদ বাড়ানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেলিগ্রামের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য অপরাধীদের আকৃষ্ট করে। তার মধ্যে রয়েছে বড় আকারের চ্যানেল পরিচালনার সুযোগ, সহজে নতুন চ্যানেল খোলার সুবিধা, পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ, স্বয়ংক্রিয় বট ব্যবহারের সুবিধা, দ্রুত লিংক পরিবর্তন ও সদস্য স্থানান্তরের সক্ষমতা।
মূলত এই সাইবার অপরাধী চক্রগুলো প্রায়ই ‘প্রিমিয়াম’ কনটেন্ট বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে এবং চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেলে নতুন চ্যানেলে সদস্যদের স্থানান্তর করে নেয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক নাফিউল নাহিদ আলম বলেন, টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপটেড ও চ্যানেলভিত্তিক প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে এখন অনেক অপরাধী গোষ্ঠী সাবস্ক্রিপশন ভিত্তিক অবৈধ কনটেন্ট ব্যবসা পরিচালনা করছে। বিষয়টি শুধু পর্নোগ্রাফি ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, অনুমতি ছাড়া ছবি ও ভিডিও প্রচার, অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, আর্থিক প্রতারণা এবং ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলের মতো গুরুতর অপরাধও যুক্ত থাকতে পারে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজপড়ুয়া বা তরুণদের ব্যক্তিগত কনটেন্ট লক্ষ্য করে এমন নেটওয়ার্ক তৈরি হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
নাফিউল নাহিদ আলম বলেন, ব্যবহারকারীরা অনেক সময় বুঝতে পারেন না যে তারা যে কনটেন্ট দেখছেন বা কিনছেন, তার বড় একটি অংশ হতে পারে অপরাধের মাধ্যমে সংগ্রহ করা বা অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
একই সঙ্গে ব্যবহারকারীদেরও অচেনা লিংক, অর্থের বিনিময়ে গোপন গ্রুপে প্রবেশ এবং ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন এই সাইবার বিশ্লেষক।
এ বিষয়ে রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র গাজিউর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পর্নোগ্রাফি তৈরি, সংরক্ষণ, প্রচার ও বাণিজ্যিকভাবে বিতরণ দণ্ডনীয় অপরাধ। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে এ ধরনের কার্যক্রমের অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।








