logo
Advertisement

আলজাজিরার এক্সপ্লেইনার/যুক্তরাষ্ট্র কেন ইরানের কেশম দ্বীপকে লক্ষ্যবস্তু করছে?

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র কেন ইরানের কেশম দ্বীপকে লক্ষ্যবস্তু করছে?
ইরানের কেশম দ্বীপ। ছবি: সংগৃহীত

যুদ্ধবিরতি ও চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই আবারও ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বাহিনীর দাবি, হরমুজ প্রণালির কৌশলগত কেশম দ্বীপে তারা ‘আত্মরক্ষামূলক’ অভিযান চালিয়েছে।

এর মধ্যেই দ্বীপটিতে দফায় দফায় বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে ইরানি গণমাধ্যম। পাল্টা হামলার দাবিও করেছে তেহরান। ফলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যে।

মঙ্গলবার (২ জুন) হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা একটি ট্যাংকারকে অচল করতে যুক্তরাষ্ট্র হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে।

পরে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, তারা অঞ্চলে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা প্রতিহত করেছে ও ইরানের কেশম দ্বীপের কয়েকটি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহের জানায়, কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং তদন্ত চলছে।

এর জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

সেন্টকম জানিয়েছে, কুয়েতের দিকে ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় বা মাঝপথেই ভেঙে পড়ে, আর বাহরাইনের দিকে ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন ও বাহরাইনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে ভূপাতিত করে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে ইরানের কেশম দ্বীপে হামলা চালিয়েছে। সেন্টকম আরও জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী সতর্ক রয়েছে এবং ইরানের অযাচিত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে প্রস্তুত।

যুক্তরাষ্ট্র কেন ইরানের কেশম দ্বীপকে লক্ষ্যবস্তু করছে?

ইরানের কেশম দ্বীপ আগে ছিল শান্তিপূর্ণ জায়গা। এটি মুক্ত বাণিজ্য, পর্যটন আর ইউনেস্কোর স্বীকৃত জিওপার্কের জন্য এটি পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। দ্বীপটি আর আগের মতো শান্ত নয়। দ্বীপটি ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি বা যুদ্ধের প্রস্তুতিস্থলে পরিণত হয়েছে।

প্রায় ১ হাজার ৪৪৫ বর্গকিলোমিটার (৫৫৮ বর্গমাইল) এলাকাজুড়ে বিস্তৃত কেশম উপসাগরের বৃহত্তম দ্বীপ। এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ট্রানজিট হরমুজ প্রণালির প্রবেশপথে অবস্থিত। দ্বীপটির অনন্য ভৌগোলিক অবস্থান ও অত্যন্ত সুরক্ষিত অবকাঠামো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণের জন্য এটিকে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।

ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক

কেশম দ্বীপকে ইরান এমনভাবে ব্যবহার করে যেন এটি সমুদ্রের মধ্যে ভেসে থাকা একটি ‘স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি’ বা ‘অবিনাশী যুদ্ধজাহাজ’। দ্বীপের ভেতরে আছে লুকানো সুড়ঙ্গ ও লবণ গুহার মতো ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক। এগুলোর মধ্যে রাখা হয় গোপন ক্ষেপণাস্ত্র, উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দ্রুতগতির ছোট নৌকা; যেগুলো হঠাৎ আক্রমণের জন্য ব্যবহার করা যায়।

‘ক্ষেপণাস্ত্র সিটি’

দ্বীপটির ভূগর্ভে ইরান নৌ-যুদ্ধের উদ্দেশ্যে উপকূলীয় কামান লুকিয়ে রেখেছে, যার সুস্পষ্ট লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করে দেওয়া।

বৈশ্বিক জ্বালানি করিডোর অবরোধ

যেহেতু ইরান সফলভাবে কেশম দ্বীপকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে প্রণালিটিতে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস ট্যাংকারগুলোর চলাচল থামিয়ে দিতে বা সীমিত করতে পারে, তাই মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্বীপটিকে চলমান জ্বালানি যুদ্ধের স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে দেখে।

প্রতিশোধমূলক সম্মুখ রণক্ষেত্র

দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গোলাগুলির একটি ঘন ঘন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, অতীতে ইরান কর্তৃক আঞ্চলিক মার্কিন স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনার পর, মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্ন ঘটানোর ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা হ্রাস করার জন্য কেশম দ্বীপে আইআরজিসি-র অবস্থান এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ‘আত্মরক্ষামূলক’ হামলা চালায়।

কেশম দ্বীপ এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। আগে ইরান আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালালে, তার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র কেশম দ্বীপে ইরানের আইআরজিসির অবস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্দিষ্ট ‘আত্মরক্ষামূলক’ হামলা চালায়।

এর উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব ও বাধা দেওয়ার ক্ষমতা কমানো।