জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বের সবচেয়ে ‘দুর্বল’ শহরের তালিকায় ঢাকা

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বের বড় শহরগুলোর সক্ষমতা নিয়ে মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে ভৌগোলিক-স্থানিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্রতিষ্ঠান আলফা-জিও। ওই মূল্যায়নে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতায় সর্বনিম্ন তালিকার প্রথম সারিতে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এই তালিকার চতুর্থ ও নবম নম্বরেই রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রাম।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্যা, উপকূলীয় বন্যা, তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল ও হারিকেনের মতো জলবায়ুজনিত ঝুঁকির পাশাপাশি এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় শহরগুলোর অভিযোজন সক্ষমতা, অবকাঠামো, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা ও নীতিগত প্রস্তুতি বিবেচনায় নিয়ে ৭২টি শহরের তালিকা করেছে আলফা-জিও।
সেই সূচকে সর্বনিম্ন সক্ষমতার শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান চতুর্থ। অর্থাৎ জলবায়ু ঝুঁকির মাত্রার তুলনায় দুর্যোগ মোকাবিলা ও অভিযোজন সক্ষমতার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ বড় শহর হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী। একই তালিকায় বাংলাদেশের আরেক বড় শহর চট্টগ্রামও রয়েছে। বিপরীতে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সবচেয়ে সক্ষম শহর হিসেবে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো।
আলফা-জিওর তৈরি করা এই সূচকে দেখা গেছে, সর্বনিম্ন সক্ষমতার তালিকায় প্রথম অবস্থানে রয়েছে ভারতের আহমেদাবাদ। এরপর পাকিস্তানের হায়দ্রাবাদ ও মুলতান। চতুর্থ অবস্থানে ঢাকা। তালিকায় এরপর রয়েছে পাকিস্তানের লাহোর, ভারতের কলকাতা, পাকিস্তানের ফয়সালাবাদ ও করাচি, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এবং তাইওয়ানের তাইপেই।
অন্যদিকে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি সক্ষম শহর হিসেবে তালিকার শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো। এরপর রয়েছে ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবা, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, স্পেনের বার্সেলোনা, তুরস্কের আঙ্কারা, আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেস, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস, তুরস্কের বৃহত্তম শহর ইস্তাম্বুল, কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতা ও কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবি।
আলফা-জিওর সূচকে একটি শহরের সহনশীলতা নির্ধারণে শুধু প্রাকৃতিক বা জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনা করা হয়নি। বন্যা, উপকূলীয় বন্যা, তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল ও হারিকেনের মতো ঝুঁকির পাশাপাশি এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় শহরটির অভিযোজন সক্ষমতাও মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই সক্ষমতা নির্ধারণে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, নীতিগত উদ্যোগ এবং বন্যা প্রতিরোধক বাঁধ ও উন্নত নিষ্কাশন ব্যবস্থার মতো অবকাঠামো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
ঢাকার ক্ষেত্রে এই ফলাফল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, শহরটি একদিকে ঘনবসতিপূর্ণ ও দ্রুত সম্প্রসারিত নগর এলাকা, অন্যদিকে জলাবদ্ধতা, বন্যা ও অতিবৃষ্টির মতো জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মুখোমুখি। ফলে শুধু দুর্যোগের সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানো নয়, দুর্যোগের পর দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সক্ষমতাও ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শহরগুলোর ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রার পাশাপাশি সেই ঝুঁকির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শহরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি তুলনামূলক কম হলেও পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও প্রস্তুতি না থাকলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বড় হতে পারে। আবার শক্তিশালী অবকাঠামো, কার্যকর শাসনব্যবস্থা ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা থাকলে একই ধরনের ঝুঁকির প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
আলফা-জিওর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী পরাগ খান্নার ভাষায়, ‘সহনশীলতা বলতে ঝুঁকি থেকে অভিযোজন সক্ষমতা বাদ দেওয়ার বিষয়টি বোঝানো হয়। সবাই সহনশীলতার কথা বললেও সেটি পরিমাপের উদ্যোগ খুব কম।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের গতি বেড়ে যাওয়ার অর্থই হলো উজানের দিক থেকে অনিবার্যভাবে অনেক বেশি পরিমাণে পানির প্রবাহ নেমে আসা। ওই অঞ্চলে শহরগুলো প্রাকৃতিকভাবেই চলাচলের উপযোগী উপত্যকায় গড়ে উঠেছে; কিন্তু সেই উপত্যকাগুলোই আবার ভূপ্রকৃতির সবচেয়ে নিচু অংশ। আর পানি স্বভাবতই সবচেয়ে কম বাধার পথ ধরে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। প্রকৃতির সামনে আমরা আক্ষরিক অর্থেই এক নগণ্য বাধা।’



