৯/১১-এর ২৫ বছর, শেষ হয়নি গোয়েন্দা ব্যর্থতার বিতর্ক

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু ওই হামলার আগে গোয়েন্দা ব্যর্থতা, পরবর্তী কৌশলগত ভুল এবং সেসব সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি। হামলার আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হাতে আল-কায়েদা ও ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকলেও সেগুলো যথাযথভাবে একত্র, বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করা হয়নি।
সেদিন আল-কায়েদার আত্মঘাতী হামলায় ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনসহ বিভিন্ন স্থানে হামলার পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন।
তথ্য ছিল, কিন্তু সমন্বয় ছিল না
৯/১১-এর আগে থেকেই সিআইএ আল-কায়েদা ও এর নেতা ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে জানত। এমনকি বিন লাদেনকে ধরতে বিশেষ টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু ৯/১১ কমিশনের তদন্তে উঠে আসে, তথ্যের ঘাটতির চেয়ে বড় সমস্যা ছিল বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং হুমকি কল্পনা ও মূল্যায়নে ব্যর্থতা।
এই অভিজ্ঞতার পর যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির কাঠামো জোরদার করে। গড়ে ওঠে ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টার ও ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের মতো প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ‘ফাইভ আইজ’ জোট গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
ইরাক যুদ্ধেও ভুল গোয়েন্দা তথ্য
৯/১১-এর পরও গোয়েন্দা ব্যর্থতার ঘটনা থামেনি। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের আগে সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র (WMD) থাকার দাবি করা হয়েছিল। পরে দেখা যায়, সেই গোয়েন্দা তথ্য ছিল ত্রুটিপূর্ণ।
ইরাক যুদ্ধের পর ব্রিটিশ গোয়েন্দা ব্যবস্থায় তথ্য যাচাই ও মূল্যায়নের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। তথ্য সংগ্রহ এবং সেই তথ্য যাচাই ও চ্যালেঞ্জ করার দায়িত্ব আলাদা করা হয়। তবে ইরাকে দায়িত্ব পালন করা ব্রিটিশ জেনারেল স্যার রিচার্ড শিরেফের মতে, ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ওপর যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সেখান থেকে যথেষ্ট শিক্ষা নেওয়া হয়নি।

সন্ত্রাস ঠেকাতেও ছিল ব্যর্থতা
২০০৫ সালের ৭ জুলাই লন্ডনে আত্মঘাতী বোমা হামলার আগেও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫-এর কাছে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী মোহাম্মদ সিদ্দিক খানের বিষয়ে তথ্য ছিল। কিন্তু তিনি হামলা চালাতে যাচ্ছেন—এটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ওই হামলায় ৫২ জন নিহত হন। ২০১৭ সালের ম্যানচেস্টার অ্যারেনা হামলাও গোয়েন্দা ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।
তবে গত ২৫ বছরে হুমকির ধরন বদলেছে। সাবেক এমআই৫ প্রধান লর্ড জোনাথন ইভান্সের মতে, অ-রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ এখনও গুরুতর হুমকি হলেও রাশিয়া, ইরান, তাদের মিত্রগোষ্ঠী এবং চীনের মতো রাষ্ট্রীয় শক্তির ঝুঁকিও এখন বড় হয়ে উঠেছে।
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অতিরিক্ত মনোযোগের মূল্য
সাবেক এমআই৬ প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়ংগারের মতে, ৯/১১-এর পর প্রায় দুই দশক পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সন্ত্রাসবাদ ও বিদ্রোহ দমনে অতিরিক্ত মনোযোগ দেয়। এর ফলে চীনের সামরিক উত্থান ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
এদিকে রাশিয়া ও চীন সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়েছে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন নতুন প্রযুক্তি ন্যাটোর দীর্ঘদিনের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে।
চীন সম্পর্কে পশ্চিমা দেশগুলোর মূল্যায়নেও ভুল ছিল। একসময় ধারণা করা হয়েছিল, অর্থনৈতিকভাবে চীনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হলে দেশটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমের কাছাকাছি আসবে। বাস্তবে তা হয়নি।
বড় চ্যালেঞ্জ এখন তথ্যের অর্থ বোঝা
চীন বর্তমানে যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অন্যতম প্রধান গোয়েন্দা লক্ষ্য। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, চীন সম্পর্কে বিপুল তথ্য সংগ্রহ করলেও সেগুলোর সামগ্রিক কৌশলগত অর্থ বোঝা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
চীনের শক্তি শুধু সামরিক সক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নয়। সেমিকন্ডাক্টর, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ব্যাটারি, বন্দর, টেলিযোগাযোগ ও শিল্প সক্ষমতাও দেশটির কৌশলগত শক্তির অংশ। ফলে গোয়েন্দা ব্যর্থতার সমস্যা অনেক সময় তথ্যের অভাবে নয়; বরং বিচ্ছিন্ন তথ্যকে একত্র করে বৃহত্তর চিত্রটি বুঝতে না পারায়।

মানবাধিকার প্রশ্নও রয়ে গেছে
৯/১১-এর পর নতুন হামলার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ব্যাপকভাবে সন্দেহভাজনদের আটক করে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে অনেককে গ্রেপ্তার করে গুয়ানতানামো বে-তে পাঠানো হয়। বিচার ছাড়াই দীর্ঘদিন আটক, নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের অভিযোগে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো সমালোচনা করে।
ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন হেফাজতে বন্দিদের নির্যাতনের ঘটনাও পরে প্রকাশ্যে আসে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধেও লিবীয় ইসলামপন্থী আবদেলহাকিম বেলহাজ ও তাঁর স্ত্রীকে অপহরণ করে লিবিয়ায় পাঠানোর ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। ২০১৮ সালে ব্রিটিশ সরকার এ ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়।
প্রযুক্তি যেমন শক্তি, তেমনি ঝুঁকি
গত ২৫ বছরে গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, মুখমণ্ডল ও আইরিস শনাক্তকরণ এবং চলাফেরার ধরন বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তি নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
তবে একই প্রযুক্তি গোয়েন্দা এজেন্টদের পরিচয় গোপন রাখা ও সীমান্ত অতিক্রম করাও কঠিন করে তুলেছে। অর্থাৎ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যেমন নিরাপত্তা জোরদার করছে, তেমনি তৈরি করছে নতুন ধরনের ঝুঁকি।
২৫ বছর পরও শিক্ষা শেষ হয়নি
৯/১১-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত হলো—গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়। সেই তথ্য সঠিকভাবে একত্র করা, তার অর্থ বুঝতে পারা এবং সময়মতো কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়াই আসল চ্যালেঞ্জ।
ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন প্রত্যাহার, ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার মতো ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, গোয়েন্দা ব্যর্থতা শুধু তথ্যের ঘাটতি থেকে তৈরি হয় না। রাজনৈতিক চাপ, ভুল মূল্যায়ন, সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা এবং কৌশলগত আত্মতুষ্টিও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই ৯/১১-এর ২৫ বছর পরও সেই ঘটনার শিক্ষা শেষ হয়ে যায়নি। বরং বিশ্বে হুমকির ধরন বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো শিক্ষা নতুন বাস্তবতায় বারবার পর্যালোচনা করার প্রয়োজন আরও বেড়েছে।


