logo
Advertisement

ট্রাম্পের দাবি হরমুজ নিয়ন্ত্রণ করছে যুক্তরাষ্ট্র, আসলেই কী তাই?

সিএনএন
সিএনএন
ট্রাম্পের দাবি হরমুজ নিয়ন্ত্রণ করছে যুক্তরাষ্ট্র, আসলেই কী তাই?
হরমুজ প্রণালি। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রায় ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যকরভাবে স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্বব্যাপী তেলের মজুত দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে এবং এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দুই শক্তি এখন এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, তা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন যে, এই প্রণালিটি (যার মাধ্যমে সৌদি আরব ও ইরাকের মতো দেশ থেকে বিশ্বের অন্যান্য স্থানে তেল সরবরাহ করা হয়) যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

গত বুধবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘তাদের (ইরান) কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আমরা এর মালিক, এবং কোনো এক সময় হয়তো তারা কিছু করার চেষ্টা করবে, আর তখনই তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। বর্তমানে আমরা খুব ভালো অবস্থানে আছি।’

এর আগে, বুধবার তিনি আরও দাবি করেন যে, মার্কিন নৌবাহিনী এই প্রণালি থেকে মাইন সরিয়ে পরিষ্কার করেছে। তবে ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত তারা এই প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবতা ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের ঘোষণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। প্রণালিতে জাহাজের ওপর হামলা ও মার্কিন-ইরান পাল্টা হামলা পুনরায় শুরু হওয়ার ক্রমাগত হুমকির কারণে জাহাজগুলো সেখানে চলাচলে নিরাপত্তা বোধ করছে না।

প্রণালিটি কি খোলা নাকি বন্ধ?

ইরানের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ এখনও কার্যকর রয়েছে। এতে ইরানের নগদ অর্থের প্রবাহ বন্ধ রয়েছে ও ইরানের সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য প্রণালিটি বন্ধ করে দিয়েছে। তবে পারস্য উপসাগরে ইরান ছাড়া অন্য গন্তব্যের উদ্দেশ্যে কিছু জাহাজ এখনও চলাচল করছে, কিন্তু সেই ট্রাফিক যুদ্ধের আগের তুলনায় সামান্য অংশ মাত্র। উদাহরণস্বরূপ, গত মঙ্গলবার মাত্র ১৪টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে যেখানে যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১২০টি জাহাজ এটি পার হতো।

এর প্রধান কারণ হলো, ‘খুব কম বাণিজ্যিক শিপিং কোম্পানি ও তাদের জাহাজগুলো বিশ্বাস করে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে পারবে,’ এমনটি জানিয়েছেন মার্কিন প্যাসিফিক কমান্ডের জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স সেন্টারের সাবেক পরিচালক কার্ল শুস্টার।

এই আশঙ্কা মোটেও ভিত্তিহীন নয়। গত সপ্তাহেই আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির অন্তত চারটি জাহাজ এই প্রণালিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। এসব হামলা বিমার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে যা যুদ্ধ চলাকালীন শিপিং কোম্পানিগুলোকে আরও নিরুৎসাহিত করছে।

সরাসরি হামলা ছাড়াও, ইরান ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি ও বাণিজ্যিক জাহাজে লক্ষ্যবস্তু পর্যবেক্ষণ করে জাহাজগুলোকে হয়রানি করতে পারে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস। রয়্যাল নেভির সঙ্গে যুক্ত এই সংস্থার মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই প্রণালি বা এর দুই পাশে থাকা পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরে জাহাজের ক্ষতির ৫৪টি রিপোর্ট পাওয়া গেছে।

তারা আরও জানায়, তিনটি জাহাজ পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে এবং ১৩টি জাহাজ অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে। শুস্টার বলেন, ‘যতক্ষণ না আপনি প্রণালির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারছেন, ততক্ষণ আপনার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই।’

সিএনএন সামরিক বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ফোর্স কর্নেল সেড্রিক লেটন একমত পোষণ করেন যে, বর্তমানে কোনো পক্ষেরই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। তিনি বলেন, ‘আপনি যা দেখছেন তা আসলে একটি অচলাবস্থা। মার্কিন বাহিনীর অবস্থান ও অবরোধ এবং অন্যদিকে মাইন ব্যবহারের হুমকি ও ছোট নৌকার মাধ্যমে জাহাজকে হয়রানি করার ইরানের ক্ষমতা ও ইচ্ছার কারণে কোনো পক্ষই আসলে প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করতে পারছে না।’

কার পাল্লা ভারী?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ের কাছেই একে অপরের ওপর চাপ সৃষ্টি করার এবং প্রণালির ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অস্ত্র রয়েছে। সাধারণত বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এবং অনেক দেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়।

প্রণালির ঠিক পাশেই অবস্থিত হওয়ায় ইরান ভৌগোলিক সুবিধা পাচ্ছে। শুস্টারের মতে, তাদের একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সুবিধাও’ রয়েছে। কারণ জাহাজ চলাচলে এই বিঘ্ন তাদের একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি জোগায়। এই প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে এসেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি সমাধান খুঁজে বের করতে বা নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে চাপে ফেলেছে।

শুস্টার বলেন, এই চাপ নভেম্বরে আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। যা ইরানের পক্ষে যেতে পারে যদি নতুন কংগ্রেস ট্রাম্পকে তেহরানের সুবিধাজনক শর্তে যুদ্ধ শেষ করতে বাধ্য করে। ইরানও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে; রেভল্যুশনারি গার্ডের একজন শীর্ষ উপদেষ্টা মঙ্গলবার বলেছেন যে, তারা ট্রাম্পের ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ ‘দীর্ঘায়িত’ করতে পারে।

মোহাম্মাদ রেজা নাগদি বলেন, ‘আমাদের এমন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে যাতে শত্রু কখনও আমাদের আক্রমণ করার সাহস না করে, যেন আমরা নিরাপদে বাস করতে পারি।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানি তেলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও বিদেশে ইরানি সম্পদ জব্দ করার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের এখনও স্পষ্ট সামরিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা রয়েছে। তবে লেটন বলেন, এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমানে বেশ চাপে রয়েছে এবং তারা দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে মোতায়েন আছে। এর অর্থ হলো, ইরানের সঙ্গে যে কোনো আলোচনায় নিজেদের প্রভাব বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের বাহিনী নতুন করে সাজাতে হবে। যেমন এই অঞ্চলে একটি নতুন ক্যারিয়ার ব্যাটল গ্রুপ নিয়ে আসা।

তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সেখানে টিকে থাকার ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।’ যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনো কারণে পিছিয়ে যায় বা অবরোধ শিথিল করে, তবে তারা আলোচনার ক্ষমতা হারাবে এবং প্রণালির ভবিষ্যত যেমন কারা এটি পরিচালনা করবে বা জাহাজ চলাচলের নতুন নিয়ম কী হবে সে বিষয়ে তাদের কর্তৃত্ব কমে যাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পকে একটি কঠিন অবস্থানে ফেলেছে যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ালে প্রভাব হারানোর এবং ছাড় দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, আবার নির্বাচনের আগে যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর চাপও রয়েছে।