logo
Advertisement

বিটিআরসির ৫১ কোটি টাকা ফেরত দিচ্ছে না পদ্মা ব্যাংক

এশিয়া পোস্ট স্পেশাল
বিটিআরসির ৫১ কোটি টাকা ফেরত দিচ্ছে না পদ্মা ব্যাংক
বিটিআরসি ও পদ্মা ব্যাংকের লোগো। কোলাজ ছবি: এশিয়া পোস্ট

বিটিআরসির আমানতের টাকা ফেরত দিচ্ছে না পদ্মা ব্যাংক (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক)। টাকা আদায়ে দফায় দফায় বৈঠক করেও লাভ হচ্ছে না। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের হস্তক্ষেপের পরও পদ্মা ব্যাংকে আটকে আছে বিটিআরসির আমানতের ২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা, সুদসহ বর্তমানে পাওনা দাঁড়িয়েছে ৫১ কোটি টাকার বেশি।

আমানতের অর্থ আদায়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও একাধিক তাগিদপত্র পাঠানো হয়েছে।

বারবার তাগিদ দিয়েও পুরো টাকা তো পাওয়াই যায়নি, বরং বিটিআরসির অনুমতি ছাড়া বেনামি ও অননুমোদিত হিসাব খুলে একাধিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে পদ্মা ব্যাংকের বিরুদ্ধে।

বিটিআরসির সাম্প্রতিক কমিশন সভায় পদ্মা ব্যাংকে আটকে থাকা স্থায়ী আমানত উদ্ধারসংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে আসে। গত ২৭ আগস্ট ৩১০তম কমিশন সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় সংশ্লিষ্টদের প্রতি পদ্মা ব্যাংকে আটকে থাকা অর্থ আদায়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় আইনি তাগিদ ও কঠোর তদারকি অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কমিশন সভা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সাবেক ফারমার্স ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় বিটিআরসি মোট ১২টি মেয়াদি আমানতের (এফডিআর) বিপরীতে ৩৮ কোটি টাকা জমা রাখে। মেয়াদ শেষ হয় ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর।

পদ্মা ব্যাংকের (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক) পাঁচটি শাখায় বিটিআরসির জমা রাখা আমানতের হিসাব।
পদ্মা ব্যাংকের (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক) পাঁচটি শাখায় বিটিআরসির জমা রাখা আমানতের হিসাব।

মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ব্যাংক ওই টাকা পরিশোধ না করে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। পরবর্তীতে টাকা উদ্ধারে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং অর্থ সচিবের মাধ্যমে দফায় দফায় চেষ্টা চালানো হয়।

এই টাকার জন্য গত ৮ বছরেরও বেশি সময়ে পদ্মা ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককে ৫৬টি চিঠি দিয়েছে বিটিআরসি। অর্থমন্ত্রী, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে পাঠানো হয়েছে ছয়টি আধা-সরকারি পত্র (ডিও লেটার)। এ ছাড়া স্থায়ী আমানত নগদায়নের জন্য পদ্মা ব্যাংকের সঙ্গে ১০ দফায় আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে।

দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনের পর মাত্র ৫টি এফডিআরের বিপরীতে সুদসহ ১৬ কোটি ১ লাখ টাকা ফেরত দেয় পদ্মা ব্যাংক। এর মধ্যে আসল টাকার পরিমাণ ছিল মাত্র ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। বাকি সাতটি এফডিআরের টাকা এখনও ফেরত পায়নি বিটিআরসি।

বাকি টাকা আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে বিটিআরসি। ১২টি এফডিআরের মধ্যে পাঁচটির টাকা ফেরত পাওয়ায় মূল ৩৮ কোটি টাকার মধ্যে এখনও আটকে আছে ২৫ কোটি টাকারও বেশি।

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত পদ্মা ব্যাংকের ৪টি শাখায় সংস্থাটির মোট সাতটি মেয়াদি আমানত বাবদ ২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার আসল অর্থ আটকে আছে। বছরের পর বছর ধরে আটকে থাকা এই টাকার ওপর অর্জিত সুদসহ বিটিআরসির মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ৫১ কোটি ৩ লাখ ৯০ হাজার ৫৫ টাকা।

শাখাভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, পদ্মা ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় ২টি এফডিআরের বিপরীতে আটকে আছে ২ কোটি ৪০ লাখ ও ৩ কোটি টাকা। মিরপুর শাখায় ১টি এফডিআরের বিপরীতে আটকে আছে ৩ কোটি টাকা।

বসুন্ধরা শাখায় ২টি এফডিআরের বিপরীতে আটকে আছে ৪ কোটি ও ৫ কোটি টাকা। ইমামগঞ্জ শাখায় ২টি এফডিআরের বিপরীতে আটকে আছে ৫ কোটি ও ৩ কোটি টাকা।

সব মিলিয়ে আসল অর্থের পরিমাণ ২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর এর ওপর জমা হওয়া সুদের পরিমাণ ২৫ কোটি ৬৪ লাখ ৪৫ হাজার ১৮৮ টাকা।

পাওনা টাকা আদায়ে চলতি বছরের ২৬ মে বিটিআরসির অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব বিভাগের উপপরিচালক পদমর্যাদার দুজন কর্মকর্তা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পদ্মা ব্যাংক পিএলসিতে থাকা বিটিআরসির মেয়াদি আমানত নগদায়নে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দেয়। তবে এরপরও বাকি অর্থ ফেরত মেলেনি।

বিটিআরসির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা দলের তদন্তে দেখা গেছে, পদ্মা ব্যাংকের বসুন্ধরা শাখা সংস্থাটির স্থায়ী আমানতের বিপরীতে তাদের না জানিয়েই কিছু অননুমোদিত ও বেনামি হিসাব খুলে একাধিকবার লেনদেন করেছে।

এই অনিয়মের প্রেক্ষিতে অডিট আপত্তি উত্থাপন করা হলে পদ্মা ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাঠায় বিটিআরসি। গত ১ মার্চ এই চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু বেনামি হিসাব খোলার বিষয়ে গত ছয় মাসেও কোনো জবাব দেয়নি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এমনকি বকেয়া আমানত ও সুদের হার পুনর্নির্ধারণের জন্য বিটিআরসির অর্থ ও হিসাব বিভাগ একাধিকবার চিঠি পাঠালেও প্রয়োজনীয় হিসাব বিবরণী বা তথ্য দাখিল করেনি।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিটিআরসির ৩১০তম কমিশন সভায় পদ্মা ব্যাংকে আটকে থাকা সরকারি অর্থ ফিরিয়ে আনতে আইন ও বিধি অনুযায়ী পদক্ষেপ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিটিআরসির অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব বিভাগ আমানত নগদায়নের কার্যক্রম জোরালোভাবে চালু রাখবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া সচল রাখতে হবে বলেও নির্দেশনায় বলা হয়েছে।