ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার ৫৫ বাংলাদেশি অবশেষে দেশে ফিরছেন

ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্নে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া ৫৫ বাংলাদেশি অবশেষে দেশে ফিরছেন। বাংলাদেশ দূতাবাস, কায়রোর সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় কনস্যুলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) মিশর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন তারা।
দেশটির বন্দরনগরী পোর্ট সাঈদের একটি অস্থায়ী কারাগার থেকে দেশে ফেরার জন্য ৫৫ বাংলাদেশির মধ্যে কয়েকজনের পরিবারের পক্ষ থেকে এয়ার অ্যারাবিয়ার ফ্লাইটের টিকিট পাঠানো হয়েছে। শনিবার রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে কায়রো থেকে G9 9598 ফ্লাইটে শারজাহর উদ্দেশে রওনা দেবেন তারা। এরপর শারজাহ থেকে একই এয়ারলাইনসের G9 9514 ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করবেন। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, রোববার বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
অন্যদিকে, পরিবারের পাঠানো টিকিট দিয়ে ৫৫ বাংলাদেশির আরেকটি অংশ কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে দেশে ফিরবেন। শনিবার দুপুর ২টা ১০ মিনিটে কায়রো থেকে QR1304 ফ্লাইটে দোহার উদ্দেশে রওনা দেবেন তারা। পরে দোহা থেকে QR638 ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে রোববার ভোর ২টা ৪০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এর আগে গত ২৪ আগস্ট লিবিয়ার তবরুক এলাকা থেকে ৫৫ বাংলাদেশিসহ মোট ৬৩ জন একটি রাবারের নৌযানে করে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন। নৌযানটির ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় ৪০ জন। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী, অনিরাপদ নৌযান এবং পর্যাপ্ত নেভিগেশন ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রার শুরু থেকেই চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েন তারা।
একপর্যায়ে সাগরে বিপজ্জনক অবস্থায় পড়ে নৌযানটি। পরে একটি ফিলিপাইনের বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের অবস্থান শনাক্ত করে ৫৫ বাংলাদেশি ও আট সুদানি নাগরিককে উদ্ধার করে। প্রায় দুই দিন এক রাত সমুদ্রযাত্রার পর ২৭ আগস্ট তাদের মিশরের পোর্ট সাঈদ বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের সংশ্লিষ্ট মিশরীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পোর্ট সাঈদে অবস্থানকালে বাংলাদেশ দূতাবাস, কায়রোর কর্মকর্তারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। গত ৪ সেপ্টেম্বর দূতাবাসের কর্মকর্তারা পোর্ট সাঈদে গিয়ে আটক বাংলাদেশিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তাদের পরিচয়, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্যসহ প্রয়োজনীয় কনস্যুলার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। একই সঙ্গে তাদের শারীরিক অবস্থা ও সার্বিক পরিস্থিতিরও খোঁজ নেওয়া হয়।
দূতাবাসের উদ্যোগে মিশরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে তাদের দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় শনিবার দেশে ফেরার সুযোগ পাচ্ছেন ৫৫ বাংলাদেশি।
দেশে ফেরার আগে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাছে নিজেদের ভয়াবহ সমুদ্রযাত্রার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তারা। অনেকেই জানান, ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় দালালদের হাতে বিপুল অর্থ তুলে দিয়েছিলেন। কেউ জমিজমা বিক্রি করে, আবার কেউ ঋণ করে সেই অর্থের ব্যবস্থা করেন। দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকজন দালালকে ১০ থেকে ২৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্ন পূরণ না হলেও মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে স্বজনদের কাছে জীবিত ফিরতে পারাকে জীবনের সবচেয়ে বড় স্বস্তি হিসেবে দেখছেন এসব বাংলাদেশি।
সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়া থেকে অনিরাপদ নৌযানে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। মানবপাচারকারী ও দালালদের প্রলোভনে পড়ে বিপুল অর্থ খরচ করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমন যাত্রায় অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা। এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা, নিখোঁজ ও প্রাণহানির ঘটনা।
পোর্ট সাঈদে উদ্ধার হওয়া ৫৫ বাংলাদেশির ঘটনাও আবারও সামনে এনেছে সেই নির্মম বাস্তবতা—ইউরোপের স্বপ্নে অনিরাপদ সমুদ্রযাত্রা কখনো কখনো মানুষকে গন্তব্যের বদলে মৃত্যুর দুয়ারে নিয়ে যেতে পারে।
দূতাবাসের তৎপরতায় ৫৫ বাংলাদেশির দেশে ফেরার খবরে স্বস্তি ফিরেছে তাদের পরিবারগুলোর মধ্যেও। একই সঙ্গে তাদের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা অন্যদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে থাকল।

