যে কারণে শ্রেষ্ঠ শবেকদর

লাইলুন অর্থ রাত, কদর অর্থ সম্মান, মর্যাদা। লাইলাতুল কদর হলো মর্যাদার রাত। আল্লাহ বলেন, ‘আমি কোরআন নাজিল করেছি বরকতময় রাতে। আমি (মানুষকে) সতর্ককারী। এ রাতে আমার আদেশে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়। আমিই প্রেরণকারী।’ (সুরা দুখান, আয়াত:৩-৫)
কদরের রাতের নেক আমলের সওয়াব তুলনাহীন। এ রাতটি রমজান মাসের ২৬তম দিবাগত রাত হওয়ার বিষয়ে আলমদের সর্বাধিক মত রয়েছে। তবে রমজান মাসের ২০ রোজার পর যে কোনো বিজোড় রাতে তা হতে পারে। এ রাতে পবিত্র কোরআন নাজিল করা হয়েছিল। আল্লাহ বলেন, ‘রমজান মাস। যে মাসে নাজিল করা হয়েছে কোরআন। এটি মানবজাতির জন্য হেদায়াত। হেদায়াতের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী হিসেবে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)
শবেকদরের ফজিলত কদরের রাতের অনেক ফজিলত রয়েছে। এ রাত হাজার রাতের চেয়ে উত্তম। কোরআনে আছে, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। তা সম্পর্কে তুমি কী জান? কদরের রাত হাজারো মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।’ (সুরা কদর, আয়াত: ১-৩)
শবেকদর বরকতময় রাত। এ রাতে শয়তান বের হয় না। জিবরাইল (আ.) ও ফেরেশতারা এ রাতে পৃথিবীতে নেমে আসেন। এ রাতে ফজর পর্যন্ত শান্তি বর্ষিত হয়।
কদরের রাত হাজার মাসের চেয়ে সেরা। তাই এ রাতে বেশি বেশি আমল-ইবাদত করতে হবে। নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত ও জিকির-আসকার করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এই রমজান মাসটি তোমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছে। এতে এমন একটি রাত রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে সব প্রকার কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৬৪৪)
শবেকদরের কয়েকটি আলামত হাদিসে কদরের রাতের কিছু আলামত বর্ণিত হয়েছে। যেমন—এক. মনোরম আবহাওয়া ও প্রশান্তিদায়ক বাতাস প্রবাহিত হওয়া। দুই. এ রাত নাতিশীতোষ্ণ। বেশি ঠান্ডাও না, গরমও না। তিন. এ রাতের পরবর্তী সকালে কিরণহীন সূর্য উদিত হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা শেষ রাতে শবেকদর অনুসন্ধান করো।’ (ইবনে খুজাইমা, হাদিস: ২১৮৯)
কদরের রাত কোনটি ২০ রমজানের পর যেকোনো বিজোড় রাত কদর হতে পারে। অমুক দিনই শবে কদর, এটি বলার কোনো সুযোগ নেই। আবু কিলাবা (রহ.) বলেন, ‘লাইলাতুল কদর রমজানের শেষ দশকে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে। কোনো বছরে ২১ তারিখে, কোনো বছরে ২৩, কোনো বছরে ২৫, কোনো বছরে ২৭ বা কোনো বছরে ২৯ হয়ে থাকে। অথবা একই বছরে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন তারিখে শবেকদর আসে। (সুনানে তিরমজি, হাদিস: ৭৯২)
ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে কদরের রাত কদরের রাতের সঠিক তারিখ রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছে। এরপর আমাকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০১৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হলো। এরপর আমার কোনো এক স্ত্রী আমাকে জাগালেন। পরে আমাকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হলো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৬)
যখন মানুষ জানবে, অমুক রাতে কদর হবে, তখন তারা অন্যান্য রাতে বেশি ইবাদত করতে চাইবে না। শুধু নির্ধারিত রাতের অপেক্ষায় থাকবে। সে জন্য আল্লাহ হয়তো তা ভুলিয়ে দিয়েছেন।
কদরের রাতে করণীয়
- দীর্ঘ রুকু ও সিজদার মাধ্যমে তারাবি ও তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া।
- বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা।
- একনিষ্ঠচিত্তে দোয়া-দরুদ ও তওবা-ইসতেগফার করা।
- রাত জেগে ইবাদত করা এবং পরিবারের সদস্যদের জাগিয়ে দেওয়া।
- অন্যান্য রাতের তুলনায় অধিক ইবাদত করা।
- اللَّهُمَّ إِنَّكَ عُفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউয়ুন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফাফু আন্নি। এ দোয়াটি বেশি বেশি পড়া।
সমাজের প্রচলিত আমল এ রাতকে কেন্দ্র করে সমাজে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালু রয়েছে। এগুলো এড়িয়ে চলা নৈতিক দায়িত্ব। যেমন—এক.নামাজ শেষে রাতে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা। দুই. বিশেষ ভোজনের সঙ্গে ওয়াজ-নসিহতের আয়োজন করা। তিন. শুধু এ রাতের জন্য বিশেষভাবে ইতেকাফ করা। চার. এ রাতে বিশেষ ফজিলত আছে, এমন মনে করে কোরআনখানি করা। পাঁচ. কবরস্থানে গিয়ে জামায়াতবদ্ধভাবে দোয়া করা। ছয়. মিলাদ করা। সাত. এ রাতে তারাবিতে কোরআন খতমকে সুন্নত বা জরুরি মনে করা।

