দক্ষিণ আফ্রিকায় আগুনে নারায়ণগঞ্জের ৫ প্রবাসীর মৃত্যু, গ্রামজুড়ে মাতম

দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্সটাউনে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো ছয় বাংলাদেশির মধ্যে তিনজনই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর গ্রামের বাসিন্দা। এ খবরের পর থেকে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
নিহতদের মধ্যে ক্রোকেরচর গ্রামের তিনজন হলেন—ফাহিম (২৯), আপন আহমেদ (২৩) ও নুর মোহাম্মদ (৫৫)। অন্য নিহত তিনজন হলেন আলীরটেকের তৈলখিরার চরের ফয়সাল (২৬), ফতুল্লার বক্তাবলী ইউনিয়নের কানাইনগর এলাকার শাহিন (৩০) এবং মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম পৌরসভার কালিন্দিপাড়ার রাজিক (৫৫)।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সোমবার (২৭ জুলাই) দিবাগত রাতের প্রথম প্রহরে কুইন্সটাউনে আলীরটেক ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রওশন আলীর ভাই রতনের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ আগুন লাগে। আগুনে পুড়ে ঘটনাস্থলেই এই ছয় বাংলাদেশির মৃত্যু হয়।
সংবাদ পেয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে মরদেহ উদ্ধার করে অগ্নিকাণ্ডের কারণ জানতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
এদিকে এই মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছাতেই ক্রোকেরচর গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। একই গ্রামের তিনজনের এমন আকস্মিক প্রয়াণে স্বজন ও প্রতিবেশীরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
নিহত ফাহিমের স্বজনেরা জানান, জীবিকার তাগিদে কয়েক বছর আগে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান। পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে নিরলস পরিশ্রম করছিলেন তিনি। কিন্তু আগুনে এক মুহূর্তেই সব স্বপ্ন ছাই হয়ে গেল।
নিহত আপন আহমেদের বাবা আলী মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সংসারের হাল ধরতে ছেলেটা বিদেশে গিয়েছিল। ওর পাঠানো টাকায় কোনো রকমে সংসার চলত। এখন আমার সন্তানকে কীভাবে ফিরে পাব?
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একই গ্রামের তিনজনের এমন করুণ মৃত্যু আগে কখনও দেখেননি তারা। পুরো গ্রামজুড়ে স্তব্ধতা বিরাজ করছে।
এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে দেশটির স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
বিকেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জ্ঞাপন করেন নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়েজ উদ্দিন, আলীরটেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন ও সদস্য (মেম্বার) রওশন আলীসহ আরও অনেকে।
স্থানীয় মেম্বার ও ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকের ভাই রওশন আলী জানান, কীভাবে আগুন লেগেছে সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন। ক্ষতিগ্রস্তরা সকলেই তার আত্মীয়স্বজন—কেউ ভাতিজা, কেউ ভাগ্নে, আবার কেউ বড় ভাই।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়েজ উদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার অগ্নিকাণ্ডে নিহত ছয়জনের মধ্যে চারজনের বাড়ি আলীরটেকে, একজনের বাড়ি বক্তাবলীতে এবং অন্যজনের বাড়ি মুন্সিগঞ্জে। ইতিমধ্যে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। সরকারিভাবে যে সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রয়েছে, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ তদন্ত শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জানা যাবে।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোবাইল ফোনে বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার অগ্নিকাণ্ডে নিহত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি ফতুল্লার আলীরটেকে এবং একজনের বাড়ি মুন্সিগঞ্জে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইউএনও নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করবেন। সরকারিভাবে যে সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রয়েছে, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ তদন্ত শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জানা যাবে।


