চট্টগ্রাম নগরীতে বসবে ১১ হাট

আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে এবার স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে মোট ১১টি পশুরহাট বসতে পারে—এমনটাই জানিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রামে তিনটি স্থায়ী পশুরহাট আছে। সেগুলো হলো বিবিরহাট, সাগরিকা হাট, পোস্তারপাড় ছাগলের বাজার।
এর মধ্যে নগরের বৃহত্তম সাগরিকা পশুরহাট ৮ কোটি ৮ লাখ ৫ হাজার ৭৮৬ টাকায় ইজারা নিয়েছেন ফজলে আলিম চৌধুরী। অন্যদিকে, মুরাদপুরের বিবিরহাট ইজারা হয়েছে ৬৮ লাখ ১০ হাজার টাকায়, যদিও গত বছর একই হাটের ইজারামূল্য ছিল ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া পোস্তারপাড় ছাগলের বাজার ইজারা দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ২১ লাখ ৭৮ হাজার ৭৮৬ টাকায়।
এর বাইরে ছয়টি অস্থায়ী হাট বসানোর অনুমতি পেয়েছে চসিক। যদিও গত বছর ১০টি অস্থায়ী হাট বসানো চসিকের এবার ১৬টি হাটের অনুমোদন চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছিল।
অনুমতি পাওয়া হাটগুলো হলো—৬ নম্বর ওয়ার্ডের নূর নগর হাউজিং এস্টেটের কর্ণফুলী পশুর বাজার, ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব হোসেন আহমদ পাড়া সাইলো রোডের পাশের টিএসপি মাঠ, ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের মুসলিমাবাদ রোডের সিআইপি জসিমের খালি মাঠ, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ওয়াজেদিয়া মোড়, ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের আউটার রিং রোডে সিডিএ বালুরমাঠ ও ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যম হালিশহর মুনির নগর আনন্দবাজার-সংলগ্ন রিং রোডের পাশের খালি জায়গা।
এর মধ্যে তিনটি হাটের দরপত্র প্রক্রিয়া চললেও বাকি তিনটির দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। ঝুলে থাকা হাটগুলো হলো—৪০ নম্বর ওয়ার্ডের মুসলিমাবাদ রোডের সিআইপি জসিমের খালি মাঠ, ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের আউটার রিং রোডে সিডিএ বালুরমাঠ ও ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যম হালিশহর মুনির নগর আনন্দবাজার-সংলগ্ন রিং রোডের পাশের খালি জায়গার হাট।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল বলেন, ছয়টি হাটের অনুমতি পেয়েছি। মানুষের চাহিদার কথা বিবেচনায় আরও কয়েকটি হাটের অনুমতি দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। আরও দুটি হাটের অনুমতি পাব আশা করছি। সব মিলিয়ে এবার ১১টি হাট বসবে। অস্থায়ী হাটগুলোর ক্ষেত্রে একটা অসুবিধা হলো, জায়গা ব্যক্তির আর ইজারা দেয় চসিক। এসব নিয়ে কিছু সমস্যা থাকায় মেয়র কিছু হাট নিজের হাতে রেখেছেন। তার লক্ষ্য আয় দ্বিগুণ করা। সেই অনুযায়ী এসব হাটের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
এদিকে আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের কোরবানির পশুর বাজারে বড় ধরনের ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পশুখাদ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাবে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করাটাই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় এই ঘাটতি পূরণে বাইরের জেলা থেকে পশু আনতে হবে, যার ফলে বাড়তি পরিবহন খরচ ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে কোরবানির পশুরহাটে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর মোট চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি। জেলার প্রায় ১১ হাজার খামারে পশু উৎপাদন হচ্ছে। স্থানীয় এসব খামারি ও গৃহস্থদের কাছে প্রস্তুত রয়েছে ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি পশু। ফলে চাহিদার তুলনায় স্পষ্ট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৫২০টি।
প্রাণিসম্পদ দপ্তরের দেওয়া প্রস্তুতকৃত পশুর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার বাজারে আসার অপেক্ষায় আছে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৯৯৯টি ষাঁড়, ৯০ হাজার ৪৮৮টি বলদ, ৪৭ হাজার ৮৩৪টি মহিষ, ১ লাখ ৯৮ হাজার ৫১৯টি ছাগল, ৪১ হাজার ৪২৩টি ভেড়া এবং ৩৩ হাজার ৭৯২টি গাভি।
অবশ্য জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ আশ্বস্ত করে জানিয়েছে, দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পশু এনে এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে। ফলে বাজারে পশুর বড় ধরনের কোনো কৃত্রিম সংকট বা হাহাকার তৈরি হবে না।
মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, পশুখাদ্য ও জ্বালানি তেলের দাম দফায় দফায় বেড়ে যাওয়ায় খামারিদের উৎপাদন ব্যয় এখন আকাশচুম্বী। লোকসানের আশঙ্কায় অনেকেই পশুপালন কমিয়ে দিয়েছেন, আবার অনেকেই টিকতে না পেরে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে। চলতি বছর চট্টগ্রামে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭৮ হাজার পশু কম উৎপাদন হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, প্রতি বছরই চট্টগ্রামে কিছুটা ঘাটতি থাকে এবং আমরা তা অন্যান্য জেলা থেকে পশু এনে পূরণ করি। তবে এবার বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। গোখাদ্যের দাম অতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়া এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে খামারিরা চরম সংকটে আছেন। ইতোমধ্যে জেলায় প্রায় ৩০০টি খামার বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয় খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পশুপালনের প্রতিটি খাতেই খরচ বেড়েছে লাগামহীনভাবে। আরবি এগ্রোর স্বত্বাধিকারী রবিউল হক চৌধুরী বলেন, আগে ব্যাংক থেকে খামারিরা যে ধরনের আর্থিক সুবিধা বা সহজ ঋণ পেতাম, এখন তা পাওয়া যাচ্ছে না। তার ওপর পরিবহন ভাড়া অনেক বেড়েছে। গত কয়েক মাস ধরে আমরা বহুমুখী সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ব্যবসা প্রায় অলাভজনক হয়ে পড়েছে।
খামারিদের মতে শুধু খাবারের বস্তা প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি খরচ বেড়েছে এই বছর। এর বাইরে একজন শ্রমিকের পেছনে মাসে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ। এ ছাড়া তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে খামারে সার্বক্ষণিক জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বেশি হওয়ায় বিদ্যুৎ খাতের এই বাড়তি খরচ উৎপাদন ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্ট ও সাধারণ ক্রেতারা আশঙ্কা করছেন, খামারিদের এই চতুর্মুখী খরচের প্রভাব সরাসরি পড়বে কোরবানির পশুরহাটে। উৎপাদন ব্যয় ও পরিবহন খরচ সমন্বয় করতে গিয়ে এবার পশুর দাম সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। ফলে আসন্ন ঈদে কোরবানির পশু কিনতে ক্রেতাদের বাড়তি বাজেটের চাপ সামলাতে হবে, এমনটাই আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের কোরবানির বাজারে ঐতিহ্যগতভাবেই লাল গরুর চাহিদা এবং কদর সবচেয়ে বেশি। ক্রেতাদের এই চাহিদার কথা মাথায় রেখে স্থানীয় খামারিরা লাল শাহীওয়াল, লাল ব্রাহমা ও দেশাল জাতের গরু পালনে বেশি জোর দেন। তবে এবার পশু পালনের খরচের সঙ্গে ক্রেতাদের বাজেটের সমন্বয় হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।



