logo
Advertisement

বিশ্ব ব্যাংকের প্রকল্প/মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায়

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজসাভার
মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায়
ছবি: সংগৃহীত

মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার নামে এলাকাবাসীর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা তুলে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠেছে সাভার পৌর এলাকায়। শতভাগ আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থায়নে চলমান একটি উন্নয়ন প্রকল্পকে পুঁজি করে অভিনব এই প্রতারণা চালিয়েছে স্থানীয় একটি অসাধু চক্র।

কাজ শুরুর প্রাক্কালে জয়পাড়া মহল্লার বাইতুল মামুর কেরামাতীয়া জামে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, পৌরসভার প্রকৌশলীদের টাকা না দিলে ড্রেন নির্মাণের কাজ হবে না।

এ বিষয়ে মসজিদের ইমাম নাজির আহমেদ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, মসজিদের সেক্রেটারি খন্দকার ফরহাদ হোসেন, কোষাধ্যক্ষ হাজী মো. শামসুদ্দিন আমাকে মাইকিং করতে বলেছিলেন। পরে আমি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেই।

ওই ঘোষণার পর খন্দকার ফরহাদ হোসেন, হাজী মো. শামসুদ্দিন, তার ছেলে মোহাম্মদ হাসান প্রিন্স এবং স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিন ও মাসুমসহ কয়েকজন ব্যক্তি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এভাবে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে বলে এলাকাবাসীর দাবি।

সাভার পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এবং স্থানীয় সরকার কোভিড-১৯ প্রতিক্রিয়া ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের (এলজিসিআরআরপি) আওতায় জামসিং জয়পাড়া মহল্লায় দুটি বড় উন্নয়ন কাজ চলছে। এর মধ্যে ১ কোটি ৪৮ লাখ ৬০ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয়ে ৮০০ মিটার 'ইউনিব্লক' সড়ক নির্মাণ এবং ৬৮ লাখ ৯৭ হাজার ৫৪০ টাকা ব্যয়ে ৩৫০ মিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণ চলছে।

এ বিষয়ে সাভার পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, এই ঘটনাটি শুনেছি আট-নয় মাস আগে ঘটেছে। তখন আমি সাভারে ছিলাম না। আমি সাভার কর্মস্থলে প্রথম দায়িত্ব গ্রহণ করার পর এই প্রকল্পের ওয়ার্ক অর্ডার দিয়েছি, তার আগেই টেন্ডার কার্যক্রম ও এই ঘটনাটি সম্পূর্ণ হয়েছিল। বর্তমানে আমাদের এই প্রকল্পের কাজও শেষ পর্যায়ে আছে। রাস্তার কাজ শেষ, ড্রেনের কাজ চলমান রয়েছে।

তিনি বলে, আমি যতটুকু জেনেছি যে, পৌরসভা একটা রাস্তা ও ড্রেনের কাজ করবে, এটা স্থানীয় কিছু অসাধুচক্র জানতে পারে। জানার পর চক্রটি প্ল্যান করে এলাকার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলেছিল এই বলে যে, আমরা কাজ করিয়ে দিচ্ছি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরও বলেন, আমাদের কাছে স্পেসিফিক অভিযোগ আসতে হবে। কোনো ভুক্তভোগী যদি অভিযোগ করে তাহলে আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবো। এবং এটি সরকারি প্রকল্প আমরা সরকারি টাকা দিয়ে কাজ করছি।

দীর্ঘ সময় পরে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার কারণ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্রে জানা যায়, ওই এলাকায় ড্রেন করা নিয়া এলাকাবাসী দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। এই বিভক্তের কারণে উঠে এসেছে প্রকল্পকে ঘিরে চাঁদা উঠানোর বিষয়টি।

প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ওই এলাকায় একটা খালের জায়গা আছে যা চিকন হয়ে গিয়েছে। ড্রেনেজ কার্যক্রমকে ঠিক রাখতে সেই খালটিকে পুনরুদ্ধার ও পুনরুজ্জীবিত করে ড্রেনের সঙ্গে সংযোগ দিতে চাচ্ছে সরকার। এতে ওই খালটি যারা দখল করছে, তারা তা চাচ্ছে না। এই না চাওয়ার কারণে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়ে মহল্লাবাসী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এবং ড্রেন নির্মাণ কার্যক্রমে যেন ব্যাঘাত ঘটে এজন্যই প্রায় এক বছর পরে বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে প্রতিপক্ষ। জানা যায়, আগে যখন একসঙ্গে ছিল, তখন সমঝোতার ভিত্তিতে এই চাঁদার টাকা তোলা হয়েছিল।

স্থানীয় যুবক এস আর জয় এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমাদের এলাকার মানুষ কিছুটা সহজ সরল। তাদেরকে মসজিদে বসে বুঝিয়েছে যে টাকা দিতে হবে, টাকা না দিলে এই কাজ হবে না। আমার কাছেও চেয়েছিল টাকা কিন্তু আমি দেইনি। হাজী শামসুদ্দিন সাহেবের ছেলে মোহাম্মদ হাসান প্রিন্স গং এই ঘটনার মূল হোতা।

ভুক্তভোগী স্থানীয় বৈশিষ্ট্য জাহাঙ্গীর আলম এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি ১০ হাজার টাকা দিয়েছি শামসুদ্দিন হাজির কাছে। বলেছে ড্রেন হবে ড্রেনের খরচ পৌরসভা থেকে দেবে না এই কথা বলে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে।

ভুক্তভোগী এক গৃহবধূ মুন্নি আক্তার জানান, তিনি ইতোমধ্যে ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন এবং তার কাছে আরও ১০ হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছিল। এ ছাড়া আকলিমা আক্তার ৩০ হাজার, স্কুল শিক্ষিকা নাসিমা আক্তার ২৫ হাজার ও আব্দুল আলী ১০ হাজার টাকা করে দিয়েছেন। সরল বিশ্বাসে ধার-দেনা করে টাকা দিয়ে এখন প্রতারিত বোধ করছেন তারা।

ঘটনায় প্রকাশ হতেই তোলপাড়

সম্প্রতি এলাকা জুড়ে জানাজানি হয় যে, প্রকল্পটি শতভাগ বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে হচ্ছে এবং এতে নাগরিকদের কোনো টাকা দেওয়ার নিয়ম নেই। এরপরই প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী টাকা ফেরত চেয়ে চাপ সৃষ্টি করে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত খন্দকার ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। অন্য অভিযুক্ত হাজী মো. শামসুদ্দিনকে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

তবে শামসুদ্দীনের ছেলে মোহাম্মদ হাসান প্রিন্স ও জসিম উদ্দিন টাকা তোলার কথা স্বীকার করে দাবি করেন, ড্রেন করার জন্যই টাকা তোলা হয়েছে এবং টাকা পৌরসভার ইঞ্জিনিয়ার অফিসে দেওয়ার পরেই কাজ হচ্ছে। তবে ইঞ্জিনিয়ার অফিসের কাকে তারা টাকা দিয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তারা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের বিষয়ে প্রশ্ন করতেই তারা সাংবাদিকদের এড়িয়ে দ্রুত সটকে পড়েন।

সাভার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ আলম মিয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, এই বিষয়টা গত মাসের দিকে আমাদের নোটিশে এসেছে, এই প্রকল্পে এলাকার লোকের টাকা নেওয়ার প্রশ্নেই আসে না। কারণ, এখানে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক টাকা দিচ্ছে, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় এই প্রকল্পটা হচ্ছে। জনগণের টাকা লাগবে কেন? এটা তো প্রশ্নেই আসে না তাদের টাকা লাগার। এরকম যদি করে থাকে, তাহলে অনুসন্ধান করে প্রকৃত অপরাধী খুঁজে বের করা উচিত কোন চক্র এই কাজ করল। কারণ, এটা পৌরসভার রাস্তা।

তিনি আরও বলেন, এই চক্রটিকে চিহ্নিত করা উচিত এবং সঠিক তদন্ত করে এটাকে বের করা উচিত। এবং ইউএনও মহোদয়, প্রশাসককে আমরা জানাব। প্রশাসক মহোদয় এই বিষয়টা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে, ঐভাবে পরবর্তী কার্যক্রম হবে।

রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের তদারকির দায়িত্বে থাকা সাভার পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) তৌফিক ইমাম রূপক জানান, ৮০০ মিটার সড়কটির কাজ করছে 'সোয়েব কনস্ট্রাকশন' এবং ৩৫০ মিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণের কাজ করছে 'ইমরান বিল্ডার্স'।

তিনি বলেন, পুরো প্রকল্পটির অর্থায়ন করছে বিশ্ব ব্যাংক। এখানে এলাকাবাসী থেকে টাকা তুলে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। যারা টাকা তুলেছে তারা অপরাধ করেছে।

ধর্মীয় উপাসনালয়ের মাইক ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে এমন নজিরবিহীন অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও টাকা ফেরতের দাবিতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন জয়পাড়া এলাকাবাসী।