মেহেরপুরে অনিবন্ধিত চিকিৎসকের ছড়াছড়ি, বাড়ছে ঝুঁকি

‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না’ প্রচলিত এই প্রবাদ এখন আর শুধু ব্যক্তিগত অবহেলার কথা বলে না; এটি যেন মেহেরপুরের জনস্বাস্থ্যের এক গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। সচেতনতার অভাব, দক্ষ চিকিৎসকের স্বল্পতা এবং সেবার সীমিত সুযোগের কারণে জেলার মানুষ ক্রমেই ঝুঁকে পড়ছেন অননুমোদিত হাতুড়ে দন্তচিকিৎসকদের দিকে। এর ফলে বাড়ছে ভুল চিকিৎসা, সংক্রমণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মেহেরপুর জেলায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) নিবন্ধিত বিডিএস ডেন্টাল সার্জন রয়েছেন মাত্র চারজন। বিপরীতে অন্তত ৯৩ জন অনিবন্ধিত ব্যক্তি দন্ত চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে কেউ ডিপ্লোমাধারী হলেও অনেকেরই নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা স্বীকৃত প্রশিক্ষণ। অথচ তারা দাঁত তোলা, রুট ক্যানেলসহ ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা নিয়মিত করছেন।
মেহেরপুর সদর উপজেলায় ২১টি ডেন্টাল কেয়ার সেন্টারের সাইনবোর্ডের আড়ালে ২৫ জন চিকিৎসা দিচ্ছেন, যাদের মধ্যে মাত্র তিনজনের বিএমডিসি সনদ রয়েছে। গাংনী উপজেলায় ১২টি এবং মুজিবনগর উপজেলায় পাঁচটি ডেন্টাল কেয়ার সেন্টার থাকলেও সেখানে কর্মরত কোনো চিকিৎসকেরই বিএমডিসি নিবন্ধন নেই। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে সাইনবোর্ড ছাড়াই আরও অনেকেই গোপনে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জেলায় একটি ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন থাকলেও এর সভাপতির নেই বিএমডিসি সনদ, বিডিএস ডিগ্রি বা স্বীকৃত কোনো ডিপ্লোমা। সংগঠনটির সদস্যসংখ্যা ৩৫। কেবল ট্রেড লাইসেন্স এবং কোনো নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার কথা বলে তারা চিকিৎসা কার্যক্রম চালাচ্ছেন। বাস্তবে নিজেরাই অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করছেন এবং প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিবায়োটিক লিখছেন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মত, এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা কার্যক্রম সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অপরিষ্কার যন্ত্রপাতির ব্যবহারে হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন রক্তবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি ভুল চিকিৎসার কারণে স্থায়ী স্নায়ু ক্ষতি, মুখমণ্ডলের বিকৃতি এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যথার মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
এ বিষয়ে মেহেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম আবু সাঈদ বলেন, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিদর্শন করা হলেও ব্যক্তিগত চেম্বারগুলো নিয়মিত তদারকির আওতায় নেই। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে বিএমডিসি সনদ ছাড়া দন্ত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নজরদারিতে আনা হবে।
তিনি আরও বলেন, ম্যাজিস্ট্রেট ক্ষমতা না থাকায় সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না, এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের সহযোগিতা প্রয়োজন।
মেহেরপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদ বলেন, অননুমোদিত দন্ত চিকিৎসার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ বা তথ্য পেলে বিএমডিসি নিবন্ধনবিহীনদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হবে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে তদারকি জোরদার করা হবে।


