logo
Advertisement

যৌথ বাহিনী ছাড়া এলাকাটিতে ঢুকতে পারত না পুলিশ

সোহাইবুল ইসলাম সোহাগ
কুমিল্লা, চট্টগ্রাম
যৌথ বাহিনী ছাড়া এলাকাটিতে ঢুকতে পারত না পুলিশ
জনমানবশূন্য সড়ক দিয়ে এগিয়ে চলছে একটি পিকআপ ভ্যান। কুমিল্লা শহরের কাঁটাবিল এলাকা। সম্প্রতি তোলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কুমিল্লা শহরের কাঁটাবিল এলাকা। অপরাধীদের আধিপত্য যেখানে সীমাহীন। গড়ে তোলা হয় মাদক কারবারের সংঘবদ্ধ চক্র। সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র মহড়া নিত্য দিনের ঘটনা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়–কাঁটাবিলে ঢুকতে গেলে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হতো যৌথ বাহিনী।

এলাকাটিতে সবচেয়ে বেশি আধিপত্য বিস্তারকারীদের একজন আবু হানিফ অপু। তার নাম সামনে আসে দুই মাস আগের একটি ঘটনায়। গত ২৪ জুন কাঁটাবিল স্কুলের পশ্চিম পাশে গুলিবিদ্ধ হয় এক স্কুলছাত্র। এর সূত্র ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে নাম আসে অপুর।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, স্কুলছাত্র গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগেও কাঁটাবিলে পুলিশ অভিযান চালাতে গেলে সশস্ত্রভাবে হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশ সদস্যদের জন্য এলাকাটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ।

অপুকে গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে হওয়া অস্ত্র আইনে মামলার তদন্ত করছেন কুমিল্লার চকবাজার পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক তাপস চন্দ্র রায়। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, যৌথ বাহিনী ছাড়া আমরা কাঁটাবিলে ঢুকতে পারতাম না। এক অপুই পুরো কাঁটাবিলকে জিম্মি করে রেখেছিল। এলাকায় গরু জবাই করে সবাইকে খাওয়াত, যে যা চাইত তাই দিয়ে দিত। সে কারণে এলাকায় তার সিন্ডিকেট বাড়তে থাকে।

মাদক কারবার থেকে জমি দখল–সবখানে অপু

এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধান বলছে, কাঁটাবিল এলাকার লিলু সর্দার বাড়ি–স্থানীয়ভাবে ‘কসাই বাড়ি’ নামে পরিচিত। এই এলাকার মৃত শাহজাহান মিয়ার ছেলে আবু হানিফ অপু। তার নেতৃত্বে কুমিল্লা নগরীতে মাদকের একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে তৈরি করা হয় অসংখ্য সাব-ডিলার। নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে অপু গড়ে তুলেছেন ২০০ থেকে ৩০০ সদস্যের একটি বাহিনী।

স্থানীয় সূত্র বলছে, তিন স্ত্রীকে তিনটি পৃথক এলাকায় মাদকের নেটওয়ার্ক কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছেন অপু। তাদের একজন আদর্শ সদর উপজেলার তেতুইপাড়া এলাকায়, দ্বিতীয়জন নগরীর ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সামবক্সি এলাকায় এবং তৃতীয়জন ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের জারু চেয়ারম্যানের গলিতে অবস্থান করেন।

অপুর বিরুদ্ধে জমি দখল ও কম দামে সম্পত্তি লিখে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালের দিকে ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের জারু চেয়ারম্যান গলির মৃত সিদ্দিক মিয়ার ছেলে জাকির মিয়ার প্রায় দুই গন্ডা (চার শতাংশ বা আড়াই কাঠা) বসতভিটা ৩০ লাখ টাকা মূল্য নির্ধারণ করে মাত্র পাঁচ লাখ টাকা বায়না দিয়ে দখলে নেওয়া হয়। এরপর থেকে জাকির মিয়া স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন বলে স্থানীয়রা জানান।

২০২৩ সালের দিকে ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের জারু চেয়ারম্যান গলির মৃত সিদ্দিক মিয়ার ছেলে জাকির মিয়ার প্রায় দুই গন্ডা বসতভিটা ৩০ লাখ টাকা মূল্য নির্ধারণ করে মাত্র ৫ লাখ টাকা বায়না দিয়ে দখলে নেওয়া হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে আবু হানিফ অপুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ২৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২০১৫, ২০১৬, ২০১৯, ২০২১, ২০২২, ২০২৩, ২০২৫ এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার হয়েছেন অপু। গত জুন স্কুলছাত্র গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি বর্তমানে কারাগারে আছেন।

পুলিশ ও স্থানীয়রা বলছেন, অপুকে গ্রেপ্তারের পর আগের তুলনায় পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে অপুকে ঘিরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের অনেক সদস্য সক্রিয় রয়েছে।

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, কাঁটাবিল এলাকা এখন ফকফকা। নিয়মিত পুলিশ টহল দিচ্ছে। জামিনে কোনো আসামি বের হলেও আমরা তাদের নজরে রাখছি।

কাঁটাবিল এলাকা ভিত্তিক সচেতন নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন বলেন, এলাকাবাসী মাদকের বিরুদ্ধে এক থাকলে এবং প্রশাসনকে ডাকলে এলাকায় মাদক কারবারিদের কোনো আস্তানা থাকবে না।

গ্রেপ্তার হওয়া আবু হানিফ অপু ও তার সামনে রাখা উদ্ধার করা অস্ত্র। ছবি: এশিয়া পোস্ট
গ্রেপ্তার হওয়া আবু হানিফ অপু ও তার সামনে রাখা উদ্ধার করা অস্ত্র। ছবি: এশিয়া পোস্ট

স্কুলছাত্র গুলিবিদ্ধের পর আলোচনায় কাঁটাবিল

স্থানীয় সূত্র বলছে, গত ২৪ জুন কাঁটাবিল স্কুলের পশ্চিম পাশে শহীদ মিয়ার দুই ছেলে সাব্বির ও হেজাজকে লক্ষ্য করে অপু ও তার ভাই আসিফ গুলি চালান। এ সময় একটি গুলি রফিক উদ্দিন মেমোরিয়াল হাই স্কুলের শিক্ষার্থী ইথান আহমেদ প্রেমের পিঠে বিদ্ধ হয়।

ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী আহত শিক্ষার্থীর বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেন। কাঁটাবিল ও আশপাশের এলাকায় জোরদার করা হয় যৌথ বাহিনীর অভিযান।

গত ১ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করে লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লা সদর উপজেলার জগন্নাথপুর এলাকা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও ছয় রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় কাঁটাবিল মসজিদপাড়ার জামাল হোসেন ও সেপু বেগমের ছেলে জামসেদ হোসেন শ্রাবণকেও বিদেশি পিস্তল ও ছয় রাউন্ড গুলিসহ গ্রেপ্তার করা হয়।

অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় পৃথক মামলা হয়। পরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে অপুর ভাই আসিফ, বড় ভাই শরীফ, শরীফের সহযোগী জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে সানি, কাঁটাবিল স্কুলের পশ্চিম পাশের ভাড়াটিয়া আশিক এবং গদারমা কলোনির ভাড়াটিয়া ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে সানির নাম বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ্যে আসেনি।

এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় স্থানীয়দের মধ্যেও মাকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা গেছে। তারা বলছেন অতীতে যাই ঘটুক না কেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ড প্রতিহত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করে যাবেন।

স্থানীয় বাসিন্দা সাদেক হানাফি বলেন, আমাদের চোখের সামনে স্কুল, ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন জায়গায় মাদক ছিল। আমরা এ মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। আশা করি কাঁটাবিলে আর মাদক থাকবে না।

কাঁটাবিল এলাকার মসজিদপাড়ার বাসিন্দা সহিদ সর্দার বলেন, ছাত্র গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে মাদকের বিরুদ্ধে আমি ছিলাম এবং ভবিষ্যতেও থাকব। প্রয়োজনে নিজের জীবন উৎসর্গ করব।

কাঁটাবিল এলাকার রফিক উদ্দিন মেমোরিয়াল হাই স্কুল। এই স্কুলের এক ছাত্র গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আলোচনায় আসে কাঁটাবিল। ছবি: এশিয়া পোস্ট
কাঁটাবিল এলাকার রফিক উদ্দিন মেমোরিয়াল হাই স্কুল। এই স্কুলের এক ছাত্র গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আলোচনায় আসে কাঁটাবিল। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কাঁটাবিল থেকে নমসূত্রপাড়া–নগরীতে মাদক কারবারের বিস্তার

এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধান বলছে, কুমিল্লা নগরীর ১৫ ও ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাঁটাবিল, গদারমা কলোনি, মুসলিম মিয়া কলোনি, মিতুল আবাসন, হযরতপাড়া, নমসূত্রপাড়া ও আশপাশের এলাকায় মাদক কারবারের বিস্তার ঘটেছে। এসব এলাকায় মাদক কারবারের পাশাপাশি অস্ত্রের মহড়া ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত একাধিক চক্র।

নগরীর ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের বজ্রপুর এলাকায় সাবেক কাউন্সিলর সাইফুল বিন জলিলের পাশের গলির চেয়ারম্যান গলি থেকে মহসিন ও তানজিল নামের দুই ভাইয়ের মাধ্যমে মাদক কারবারের বিস্তার ঘটে। পরে কাশারিপট্টি মসজিদের উত্তর পাশ, চুন্নু বাবা মাজারের উত্তর পাশের গলি, মৌলভীপাড়া পুকুরের পশ্চিম পাশ, মুসলিম মিয়া কলোনি, গদারমা কলোনি, কাঁটাবিল রফিক উদ্দিন মেমোরিয়াল হাই স্কুলসংলগ্ন এলাকা ও মিতুল আবাসনে একাধিক মাদক কারবারের স্পট গড়ে ওঠে। মহসিন কুমিল্লা অজিতগুহ কলেজের সাবেক জিএস খোকন হত্যা মামলার অন্যতম আসামি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মৃত রফিক মিয়া ওরফে জিন রফিকের ছেলে জুম্মনের নেতৃত্বে এসব এলাকায় মাদক কারবারের বিস্তার ঘটে। চকবাজার এলাকায় অস্ত্র মহড়া মামলার অন্যতম আসামি হিসেবে তার নাম রয়েছে। তার সহযোগী হিসেবে জনি ও পাপ্পুর নামও উঠে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, যারা মাদক কারবার ছেড়ে দিয়েছিলেন, তাদেরকে নতুন করে ফেরাতে চাপ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। হযরতপাড়া মসজিদের পূর্ব পাশে রুশিয়া বেগম এবং নমসূত্রপাড়া মন্দিরের পেছনে ও মূল সড়কের পশ্চিম পাশে বেলাল নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক বিক্রির অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুজ্জামান বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। নিয়মিত মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। শুধু অভিযান চালিয়ে পুলিশ ক্ষান্ত হচ্ছে না, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কাঁটাবিলের ঘটনায় প্রধান আসামি অপুকে অস্ত্রসহ আমরাই গ্রেপ্তার করেছি।