
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের অসমাপ্ত কাজগুলো পুনরায় শুরু করার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে এক পোস্টে এ আহ্বান জানান তিনি।
ফেসবুক পোস্টে জাদুঘরে আসা দর্শনার্থীদের কয়েকটি ছবি জুড়ে দিয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী লিখেছেন, ‘জনতার জুলাই, জনতার আত্মায়। আমার স্রেফ একটা কথাই আছে বলার—জাদুঘরের অসমাপ্ত কাজগুলো আবার শুরু করার উদ্যোগ নেন, জনবল নিয়োগ দেন, আর যেসব পরিকল্পনা নিয়ে আমরা শুরু করেছিলাম সে কাজগুলো করেন, তাহলে এই জাদুঘর আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কালচারাল সেন্টারে পরিণত হবে।’
এটা একই সঙ্গে কালচারাল ডিসকোর্স এবং প্রোডাক্ট তৈরিতেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি। পোস্টের শেষে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘যারা শোনার তারা কি মনোযোগ দিয়ে শুনছেন, ভাইয়েরা আমার?’
মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর এই পোস্টের সূত্র ধরে এশিয়া পোস্ট শনিবার রাতে তার কাছে জানতে চায়, জুলাই যাদুঘরে কি কি অসমাপ্ত কাজ শুরু করার কথা তিনি বলতে চেয়েছেন? জবাবে তিনি বলেন, দেখেন এই যাদুঘরটা সবসময় ওয়ার্ক ইন প্রগ্রেস (চলমান কাজ) একটা যাদুঘর। জুলাই এবং এর জেনেসিস একটা বিশাল সাবজেক্ট। এটা একবারে দাঁড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপার না। আমরা জানতাম উদ্বোধনের পর প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জিনিস যুক্ত করতে হবে। আমাদের পরিকল্পনাই ছিলো একটা রিসার্চ সেলের মাধ্যমে এই যাদুঘরে প্রতিমাসে নতুন নতুন জিনিস যুক্ত করা। যাতে মানুষ এখানে বার বার আসে।
এশিয়া পোস্টের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, কিউরেটরিয়াল কাজের মধ্যে বাকী ছিলো সকল শহীদের স্মারকের সাথে পরিবারের শোক এবং বিচ্ছেদের গল্প যুক্ত করা। জুলাই রেকর্ডস নামে একটা প্ল্যাটফর্ম এই বিষয়ে দারুন কাজ করছিলো। তাদের সাথে আমদের কোলাবরেশনের মাধ্যমে শহীদদের সেকশনটাকে আরো এনগেজিং করার পরিকল্পনা ছিলো। যাতে স্রেফ স্মারক না রেখে প্রতিটি শহীদের এবং তার পরিবারের গল্পটাও বলতে পারি। অন্তবর্তী সরকারের সময়কালে এই কাজটা মাঝপর্যায়ে ছিলো বলেও জানান তিনি।
বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর নিয়ে একটা সেকশন করার কথা ছিলো যাতে ফ্যাসিবাদের জেনেসিস (উৎপত্তি) বোঝা যায় উল্লেখ করে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জানান, ঢাকার বাইরের জেলাগুলোর আন্দোলন নিয়ে একটা আলাদা সেকশন করার পরিকল্পনা ছিল। একইসাথে প্রবাসীদের নিয়ে আলাদা একটা সেকশন করার কথা ছিল। ডাক্তারদের ভূমিকা রাখার কথা ছিলো। সেনা সদস্যদের ভূমিকার অংশটাও বাকী ছিলো। কারন ওটা ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো এখনো আছে তবে কমপ্লিট সেকশন হিসাবে না। জার্নালিজম আন্ডার ফ্যাসিজম নামে একটা সেকশন করার কথা ছিল বলেও জানান তিনি।
ফারুকী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই যাদুঘরে কোনো লোকবল দেয়া হয় নাই। এটা চলছে ভলান্টিয়ার দিয়ে। প্রায় পাঁচ মাস সময় হাতে পেয়েও কোনো লোকবল না দেয়া বিস্ময়কর ঘটনা। এখনো প্রতিটা দিন একটা যুদ্ধের মতো সামাল দিচ্ছে ভলান্টিয়াররা। কিন্তু এটা নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যথা দেখছিনা। তার অভিমত, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ঘুম হারাম হয়ে যাওয়ার কথা ছিল এই অবস্থায়।
এর আগে, পৃথক এক পোস্টে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জানান, জুলাই জাদুঘর গড়ে তোলার কাজ ছিল ‘আক্ষরিক অর্থেই একটি যুদ্ধের মতো’। মন্ত্রণালয়ের শত শত কাজের মধ্যে মাত্র এক বছরের মধ্যে শূন্য থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘরের কাঠামো দাঁড় করানো ছিল অত্যন্ত কঠিন একটি দায়িত্ব। এই কাজ করতে গিয়ে তার আয়ুসহ অনেক কিছু কেড়ে নিলেও শত শত শহীদ যেখানে জীবন দিয়েছেন, সেখানে এই কষ্ট তেমন কিছুই নয় বলে মনে করেন তিনি।
শূন্য থেকে এ পর্যন্ত জাদুঘরটি দাঁড় করানোর পেছনে যাদের দিন-রাতের শ্রম রয়েছে, তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান ফারুকী। তার ভাষ্য, এখন পর্যন্ত যারা জাদুঘরটি পরিদর্শন করেছেন তারা আবেগ সংবরণ করতে পারেননি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পত্রিকায় এই জাদুঘর নিয়ে ইতিবাচক পর্যালোচনা প্রকাশিত হয়েছে। টিম লিডার ও আর্টিস্টিক ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করার সময় কঠোর ভূমিকা পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট সবার কাছে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করার সময় ফারুকীর তত্ত্বাবধানে শুরু হয় ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ নির্মাণের কাজ, যার বড় অংশ শেষ হয় তার দায়িত্বকালেই। গত ৫ আগষ্ট আনুষ্ঠানিকভাবে জাদুঘর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

