পছন্দের কর্মকর্তাকে দিয়ে অডিট, তদন্তের মুখে হিসাব নিয়ন্ত্রক মাশুক বিল্লাহ

পছন্দের কর্মকর্তাদের দিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলার অডিট করিয়েছেন তিনি। দায়িত্ব বণ্টন করেছেন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই। একাধিক জেলার অডিটে পাঠানো হয়েছে একই ব্যক্তিকে। এসব কাণ্ডে অভিযোগের তীর হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) দপ্তরের হিসাব নিয়ন্ত্রক মো. মাশুক বিল্লাহ আরেফ খানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে কর্মকর্তাদের বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অডিটে পাঠানো হয়েছে। বিধিবহির্ভূতভাবে বদলি করা হয়েছে। এমনকি ভয়ভীতি দেখিয়ে আর্থিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টারও অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে গত ৭ সেপ্টেম্বর তদন্ত কমিটি গঠন করে ভূমি মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আখতার হোসেনকে আহ্বায়ক করে করা এই কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় নথিও চাওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া লিখিত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ বলেন, ‘অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়েছে। একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার আগে কোনো ধরনের মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।’
নিয়ম অনুযায়ী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অডিটের দায়িত্ব পালন করার কথা তত্ত্বাবধায়ক (রাজস্ব) কর্মকর্তাদের। কিন্তু তার পরিবর্তে এক ধাপ ওপরের সহকারী হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের দিয়ে এই দায়িত্ব পালন করানো হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাকে নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে কাজে পাঠাতে হলে মন্ত্রণালয়ের মৌখিক বা লিখিত অনুমোদন আবশ্যক। এক্ষেত্রে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
নথিতে দেখা যায়, গত ৫ মে ঢাকা বিভাগের সহকারী হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) আবুল কাশেমকে একটি অডিটের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগেও ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের অডিটের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছিল।
ময়মনসিংহ বিভাগের সহকারী হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আনিছুর রহমান। গত জুনে তাকে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অডিটের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অডিটের দায়িত্বও পান তিনি।
চট্টগ্রাম উত্তর বা চট্টগ্রাম দক্ষিণের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব না দিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের সহকারী হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) দিদারুল আলম পাটোয়ারীকে তিন পার্বত্য জেলার অডিটের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মাশুক বিল্লাহর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় শ্রেণির হিসাব তত্ত্বাবধায়ক (রাজস্ব) কর্মকর্তাদের বিধিবহির্ভূত বদলির অভিযোগও রয়েছে। এ বিষয়ে অবগত সূত্রগুলো বলছে, কিছু কর্মকর্তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে অন্য জেলায় বদলি ও মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো হয়েছে।
তদন্ত কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছেন, এ বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হবে। অডিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সফরসূচি, টিএ/ডিএ বিল, ভাউচার, অনুমোদনপত্র, অডিট রিপোর্ট, দায়িত্ব বণ্টনের আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবের নথি মিলিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে একই কর্মকর্তা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন জেলার অডিটের দায়িত্ব পেয়ে থাকলে তার সফর ব্যয়, সময়কাল, অডিটের ফলাফল এবং দায়িত্ব বণ্টনের সিদ্ধান্তগুলোও পর্যালোচনা করা হবে।
তদন্ত কমিটির সামনে আগামী রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) এ বিষয়ে মো. মাশুক বিল্লাহ আরেফ খানের শুনানি রয়েছে। সামগ্রিক বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে মাশুক বিল্লাহ এ প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন, তিনি আগের নিয়ম অনুসরণ করে কাজ করেছেন। অতীতে মাঠপর্যায়ে কাজ করে এখানে দেড় বছর দায়িত্ব পালন করছেন। কোনো ভুল হয়ে থাকলে সেটি তার অজ্ঞতার কারণে হতে পারে।



