
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলা শুরুর সময় একগুচ্ছ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরমধ্যে ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা এবং তেহরান যাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা পাল্টাপাল্টি হামলার পর বুধবার (১৭ জুন) দুই পক্ষের মধ্যে একটি প্রাথমিক শান্তি চুক্তি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প আসলে কী অর্জন করলেন?
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এ যুদ্ধের আগে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সবচেয়ে বড় ভান্ডার ছিল। সেখানে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের খবর পাওয়া যায়। এর মধ্যে কোনো কোনোটির পাল্লা ছিল ২ হাজার কিলোমিটার, যা সরাসরি ইসরায়েলে আঘাত হানতে সক্ষম। এ ছাড়া ইরান প্রচুর পরিমাণে দূরপাল্লার ড্রোন তৈরি করত। বিশেষ করে তাদের ‘শাহেদ’ ড্রোন রাশিয়া ও তেহরান উভয়ই ব্যবহার করেছে।
যুদ্ধের প্রায় এক মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানায়, ইরানের এই অস্ত্রভান্ডারের এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়েছে। আরও এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে।
গত ১৪ মে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার কংগ্রেসকে বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির সক্ষমতা কয়েক বছর পিছিয়ে গেছে। যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের অন্তত ১ হাজার ৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৬ হাজার ড্রোন ধ্বংস করেছে। তবে ইরান এখনও পুরোপুরি শক্তিহীন হয়ে পড়েনি। তারা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নাগালে পৌঁছানোর ক্ষমতা রাখে। গত ৬ জুন তারা কুয়েত ও বাহরাইনে এবং ৭ জুন ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তবে এসব দেশ জানিয়েছে, হামলায় বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
প্রচলিত সামরিক শক্তি
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা ইরানের প্রচলিত সামরিক শক্তিকে অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। অ্যাডমিরাল কুপার জানান, মার্কিন বাহিনী ইরানের ১৬১টি নৌযান ধ্বংস করেছে এবং তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ৮২ শতাংশ অকেজো করে দিয়েছে।
যুদ্ধের আগে ইরানের বিমানবাহিনী প্রতিদিন যেখানে প্রায় ১০০টি বিমান উড়াতো সেখানে এখন তারা কোনো মিশনই পরিচালনা করছে না।
তবে এত কিছুর পরেও ইরান সফলভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখতে পেরেছিল। স্পিডবোট, মাইন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তারা এই জলপথ পুরো যুদ্ধকালীন সময়ে আটকে রাখে। এই পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করা হয়।
পারমাণবিক কর্মসূচি
ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, তার প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা। যদিও তেহরান বরাবর বলে আসছে তাদের এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। তবে এই যুদ্ধ ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতায় বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের গত মাসের হিসাব অনুযায়ী, ইরান চাইলে এখনও এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে পারবে। অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর পরিস্থিতি যেমন ছিল, এখনও তেমনই আছে।
এরইধ্যে বুধবার (১৭ জুন) ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ভার্সাই প্রাসাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মাসুদ পেজেশকিয়ান সমঝোতা স্বারকে সই করেছেন। এ চুক্তিতে পারমাণমিক বিষয়টি পরবর্তী ধাপের আলোচনার জন্য মুখ্য করে রাখা হয়েছে। তবে ট্রাম্প চাইছেন ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি তাতে রাজি নন বলে জানা গেছে।
ইরানের প্রক্সিবাহিনী
গত ২ মার্চ হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরাক, লেবানন, গাজা ও ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ইরান আর অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দিতে পারবে না। ইরান এই সহায়তা বন্ধের কোনো লক্ষণ দেখায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও স্বাধীন বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই প্রক্সি নেটওয়ার্ক এখন আগের চেয়ে অনেক কম কার্যকর। এর অনেক কিছুই যুদ্ধ শুরুর আগে শুরু হয়েছিল।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার পর ইসরায়েল গাজায় হামাসের অনেক শীর্ষ নেতা ও হাজার হাজার যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। লেবাননেও হিজবুল্লাহর অনেক নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর ইরান থেকে হিজবুল্লাহর কাছে অস্ত্র পৌঁছানোর প্রধান পথটি বন্ধ হয়ে যায়। নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণেও ইরান এসব গোষ্ঠীকে আগের মতো অর্থ দিতে পারছে না।
এই যুদ্ধে হামাস গাজা থেকে ইসরায়েলে বড় কোনো হামলা করেনি। আবার ইয়েমেনের হুতিরাও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বড় কোনো বিঘ্ন ঘটাতে পারেনি। তবে গত ২ মার্চ হিজবুল্লাহ সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেয়। এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননে আক্রমণ চালায়। এতে লেবাননে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মানুষ নিহত এবং ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের ২৮ জন সৈন্য ও ৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। অ্যাডমিরাল কুপার জানিয়েছেন, ইরান এখন আর আগের মতো এসব বাহিনীকে উন্নত অস্ত্র দিতে পারছে না।
ক্ষমতা পরিবর্তন
যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্প ইরানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র বিরোধী বিক্ষোভকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, তাদের শাসকদের উৎখাত করার জন্য। ২৮ ফেব্রুয়ারি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুকে তিনি ক্ষমতা দখলের বড় সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন।
৬ মার্চ ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ এবং ‘গ্রহণযোগ্য’ নেতা ছাড়া যুদ্ধ থামবে না।
যদিও এই যুদ্ধে ইরানের ধর্মতাত্ত্বিক সরকারের পতন হয়নি, ট্রাম্প এখন দাবি করছেন তিনি লক্ষ্য পূরণ করেছেন। কারণ, আলী খামেনির জায়গায় তার ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব নিয়েছেন।
গত ২৯ মার্চ ট্রাম্প এই নতুন নেতৃত্বকে একটি ‘যৌক্তিক শাসনব্যবস্থা’ হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পকে আর ইরানি নেতাদের উৎখাত করার ডাক দিতে দেখা যায়নি।
রয়টার্স থেকে অনূদিত
লেখক: অ্যান্ডি সুলিভান ওয়াশিংটনভিত্তিক রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণী বিটের রয়টার্সের প্রতিবেদক। একই সঙ্গে তিনি ‘স্যাটারডে নাইট লাইভ’ টেলিভিশন শোতেও কাজ করছেন।




